kubas-short story-bengali
কুবাস,,
নাসরীন মুস্তাফা,,
মিটিঙের মাঝখানে, সবার সামনে, টেবিল ভাসিয়েই ওয়াক্ করে বমি করে দেয় আলমগীর।
মহাপরিচালক মহোদয় তখন কেবল মাত্র ত্রৈমাসিক কর্মপরিকল্পনার তিনটি ধাপ শেষ করেছেন। তিনিই বলেছিলেন, মিটিঙে দেওয়া নাস্তা খেতে খেতেই সবাই কথা শুনতে পারবেন। সবাই সমুচা-মিস্টি আর পেয়ারায় যার যার মতো কামড় দিয়ে যথাসাধ্য কম শব্দ করার চেষ্টা করে চিবুচ্ছিল। আলমগীরও। পানি খেয়েছিল। এরপর চায়ের স্বাদ নেবে বলে হাত বাড়ালো কাপের দিকে। আর তখনি ঘটে গেল ঘটনাটা। টেবিল ভাসিয়ে ওয়াক্ করে বমি!
মহাপরিচালক মহোদয় কয়েক সেকেন্ড থেমেই আবার কথা বলতে থাকেন। আলমগীর অত্যন্ত বিব্রত ভঙ্গীতে টেবিল থেকে উঠে ছুট দেয় ওয়াশরুমের বেসিনের দিকে। অনেক অনেক বমি করতে হবে ওকে। করলোও তাই। অনেক অনেক বমি করার পর খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘেমে নেয়ে ওয়াশ রুমের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শ্বাস নিতে থাকে। চারিদিকে বমির গন্ধ টের পাচ্ছে। তা পাক্। বমির গন্ধও অনেক ভাল। একটু আগে ওর নাক যে গন্ধ পেয়েছিল, তা সহ্য করা যায় না। বর্ণনা করাও সম্ভব নয় ওর পক্ষে।
অফিস থেকে আধা বেলা ছুটি মিলে গেল। কলিগরা এক একজন একেক রকমের পরামর্শ দিচ্ছিল। আলমগীর কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। খুব দুর্বল লাগছিল ওর। বেরিয়ে আসার সময় জেনারেল সার্ভিস বিভাগের মোহিত ভাইয়ের কাছে না গিয়ে পারলো না। অফিসের গাড়ি-কার কি লাগবে-পুরো অফিস কিভাবে সাফ সুতরো রাখতে হবে, এসব দেখভাল করে মোহিত ভাই। খুব নীচু স্বরে মোহিত ভাইকে বললো, মিটিঙ রুমে ভাল করে হারপিক-ফারপিক ছেটানো দরকার ভাই। বাজে গন্ধ লেগেছিল নাকে। বমি এসে যাওয়ার মতো বাজে গন্ধ।
যে কোন মিটিঙের আগেই রুমটা আরেকবার ঝাড়পোছ করিয়ে সুগন্ধি এয়ারফ্রেশনার ছেটানোর সিস্টেম আছে অফিসের। মহাপরিচালক স্যার যদি মিটিঙে থাকেন, তবে নেওয়া হয় বাড়তি সতর্কতা। আজ সকালেও সেরকমটিই করা হয়েছিল। মোহিত ভাই নাকি নিজে গিয়ে যাচাই করেছেন। লেমন সুবাসের ফ্রেশনারের গন্ধ উড়ছিল ডানা মেলে দেওয়া গাঙচিলের মতো। মোহিত ভাই আলমগীরের পিঠে চাপড় মেরে বলে, মিয়া তুমি ফাইজলামি করো? বাজে গন্ধ নিশ্চয় তোমার মোজা থেকে এসেছিল।
না ভাই। ঐটা মোজার গন্ধ না। আমার মোজা তো নয়ই, আমার আশেপাশের কারোর মোজার গন্ধ না। অন্য কিছু।
অন্য কিছুটা কি?
জানি না। খুব বাজে।
মোহিত ভাই আবারো চাপড় মেরে একটু গম্ভীর হয়ে বলে, রাতে ঘুম হয়নি নিশ্চয়ই। যাও, বাসায় গিয়ে ঘুমাও। ঘুমের উপর ওষুধ নাই।
কথা সত্যি। কিন্তু আলমগীর গাঢ় ঘুমের ভেতর আবার সেই গন্ধটা পেয়ে ছটফট করে জেগে উঠলো। অবচেতন মন ওকে ছুটিয়ে নিয়ে গেল বেসিনের কাছে। ততক্ষণে বমি শুরু করেছে বলে মেঝে ভেসে গেল খানিক। তারপর বেসিন। কল ছেড়ে দিয়ে ও কেবলি ওয়াক্ ওয়াক্ করতে থাকলো।
আলমগীরের খুব কান্না পাচ্ছিল। অনেকক্ষণ ধরে বমি করে ওর বুক-পিঠ-পাঁজর যেন ভেঙ্গে যাচ্ছে। তবে কষ্টটা মনে হচ্ছে বমি না, গন্ধটা কেন পাচ্ছে সেই কষ্ট। ঘরের স্বাভাবিক গন্ধের বাইরে আর কোন গন্ধ নেই। আলমগীরও যে সব সময় পাচ্ছে, তা নয়। হঠাৎ ঘনিয়ে আসে, হাল্কা থেকে তারপর তীব্র হতে থাকে। তীব্র হতে হতে আরো তীব্র হয়। দম নিতে ইচ্ছে হয় না। নাক চেপে ধরে দেখেছে, গন্ধটা নাক ছাড়াই কেমন করে যেন মাথার ভেতর ঢুকে যায়। তারপর ছড়িয়ে পড়ে মাথার ভেতরেই। বমি করে ও আসলে মাথার ভেতর থেকে গন্ধটাকে টেনে বের করতে চায়। সেটা তো আর হয় না। পেট খালি হয় শুধু। গন্ধটা নিজে থেকেই এক সময় ছেড়ে দেয় ওকে, হাল্কা হতে হতে মিলিয়ে যায়। তারপর চলে যায়। আলমগীর তখন কাঁদে। প্রথমে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। এখন কাঁদছে হাউমাউ করে।
অফিস-টফিস মাথায় উঠে গেল এরপর। গন্ধটা কখন শুরু হবে, এই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে বেচারা। গন্ধটা আসতে আসতে চিৎকার করতে থাকে, আমি মরে যাব। আমি আর বাঁচবো না।
সব শুনে মোহিত ভাই আলমগীরকে নামকরা এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। বদহজম তো বটেই, গ্যাস্ট্রিক-আলসারের ভাল চিকিৎসক বলে খুব সুনাম নাকি তার। সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় না। মোহিত ভাইয়ের বড় বোনের ভাশুর বলে বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টেই যাওয়া গেল।
এই ডাক্তার ওকে পাঠাল নাক-কান-গলার ডাক্তারের কাছে। নাকের সমস্যা আছে কি না, দেখা হ’ল। কোন সমস্যা নেই। অনেক সময় মাথায় টিউমার-ফিউমার হলে নাকি রোগী এমন গন্ধ পায়, যা আদতে নেই, এমন তথ্য জানিয়ে এই ডাক্তার রেফার করলেন মাথার ডাক্তারের কাছে। মাথা ব্যথা হয়? আর সব মানুষের মতো আলমগীরেরও মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা হয়। তবে এই গন্ধটা যখন পায়, তখন মাথা ব্যথা হয় না, কিছুই হয় না। বমি তো ও নিজে থেকে করে। শরীরের ডিফেন্স মেকানিজম ওকে দিয়ে বমি করায়।
মাথার ডাক্তার বলছিলেন, ফ্যান্টোসমিয়া নামে একটি সমস্যা আছে, যা মস্তিষ্কের কেন্দ্রে এমন ঝামেলা বাঁধায়, যাতে মস্তিষ্ক ধারনা করায়, গন্ধ পাচ্ছ তুমি। এই গন্ধের নাম ফ্যান্টম গন্ধ। যার পাওয়ার কথা, কেবল সে-ই পায়, তার সাথে থাকা আর কেউ পায় না। অথচ এই গন্ধ যে পাচ্ছে, তার ধারে কাছে নেই গন্ধের উৎস।
আলমগীরের পুরো মাথা স্ক্যান করেও কিছুই পাওয়া গেল না। এরপর পুরো শরীরেরও স্ক্যান করা হ’ল। কোথাও কোন সমস্যা নেই। থায়রয়েড ক্যান্সারের রোগি নাকি সিগারেটের গন্ধ পায়। আলমগীরের থায়রয়েড ক্যান্সার আছে কি না, সেটাও খুঁজে দেখ্ াহ’ল। ডায়াবেটিসের রোগির রক্তে শর্করার হার অনেক বেশি হয়ে গেলে নাকি কোন কিছু পুড়ে যাওয়ার গন্ধ পায়। আলমগীরের রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিক।
এলোপেথিতে কাজ হবে না জানিয়ে মোহিত ভাই ওকে হেমোপ্যাথির ডাক্তারের কাছেও নিল। ছোট বড়ি, বড় বড়ি, সাদা তরল, লাল তরল, অনেক রকমের ছোট ছোট কাঁচের বোতল সাফ করে দিয়েও কোন কাজ হ’ল না। রিসেপশনিস্ট রীতার পরামর্শে কবিরাজিও বাদ যায়নি। নাহ্, গন্ধটা রেহাই দেয়নি ওকে। বমি তাই করতেই হয়। শুকিয়ে হাড্ডি হয়ে যাওয়া আলমগীরের চোখ ঢুকে গেছে গর্তের ভেতর, চোখের নিচে কালি পড়েছে, চোয়াল তোবড়ানো। কয় কেজি ওজন কমে গেছে, সেই হিসাব করা ছেড়ে দিয়েছে ও। কেননা, এতে কোন লাভ নেই। ওজন কমতে কমতে ও বোধহয় একদিন হাত থেকে ছুটে যাওয়া বেলুনের মতো উড়ে যাবে আকাশে। উড়ে যাওয়ার আগে বাড়িতে খবর দেওয়া উচিত। মা মরে যাওয়ার পর বাপটা আবার বিয়ে করেছিল আলমগীরের দেখভাল করার যুক্তি দেখিয়ে, তবে সেই মা আলমগীরকে যে দেখভাল করতো, তার যন্ত্রনায় আলমগীরকে বাধ্য হয়ে এতিমখানায় যেতে হয়। যেভাবেই হোক, বড় হয়েছে, একলা একা জীবনে ভালই ছিল। চাকরি পেয়ে ভাবছিল বিয়ে করবে। সেই গানটাও শিখেছিল। বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে; বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে, সই গো!
ফুলের গন্ধ মানে ভাল গন্ধ। সুবাস। আলমগীর সুবাস পায়, তবে তা আর মন টানে না। কুবাসের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকা আলমগীর কেবলি ভাবে, কীসের গন্ধ পাই আমি?
গন্ধটার বর্ণনা দিতে গিয়ে ও কোন কিছু নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না। কখনো মনে হয়, গরম পেশাবের সাথে পচে যাওয়া ভিনিগার মেশানো। কখনো মনে হয় পচা কমলার সাথে বাসিপচা কাঁচা মাংস, উপরে দারুচিনি গুঁড়া ছড়িয়ে দেওয়া। অচেনা গন্ধটাকে চেনার জন্য ও নানা গন্ধের কাছে যায়। ডাস্টবিনের ময়লা ঘাঁটে। ড্রেনের পচা পানির কাছে নেয় নাক। মাছ বাজারে পচা মাছের গন্ধ শুঁকতে গিয়েছিল। ওর কান্ড দেখে মাছওয়ালারা মাছের পানি ছুঁড়ে মেরেছিল গায়ে। একজন তো বলেই বসলো, পচা বাস ভাল্লাগলে মইরা ভুত হইয়া যাওয়া মড়ার কাছে যা ব্যাটা!
আলমগীর তা-ই করেছিল। মোহিত ভাইয়ের বড় বোনের ভাশুরের প্রভাব খাটিয়ে হাসপাতালের মর্গে যায় ও। সাথে ছিল মোহিত ভাই আর ওর বাবা হানিফ মিয়া। ছেলের খবর শুনে ব্যবসাপাতি ছেড়ে আসা মানুষটার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। লাভ খুব ভাল বোঝে সে। লোকসানের ভেতর কখনো ছিল না। আজ কেন থাকবে?
দরজাটা বন্ধ। সেই বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়ানো আলমগীরের মাথার ভেতরে কে যেন বলে ওঠে, এখানেই আছে সেই গন্ধটা। মৃত্যুর গন্ধ। শরীরে পচন না ধরতেই যে গন্ধটা আঁকড়ে ধরে মরা মানুষের স্থির শরীরটাকে, আলমগীরের মাথার ভেতরে বাস করে ঠিক সেই গন্ধটাই। শরীরটা পচন ধরতে ধরতে ওর মাথায় ভরে যায় তীব্র গন্ধ, শরীরটা কেউ যখন দয়া করে দূরে সরিয়ে নেয়, তখনি যেন ওর মুক্তি মেলে গন্ধ থেকে।
গন্ধটাকে চিনতে পেরেই আলমগীর টের পায়, মাথার ভেতরে শুরু হয়েছে পুরনো দিনের এক সাদা কালো চলচ্চিত্র। মাটিতে পড়ে থাকা এক নারীর শরীরে হাতের আঙ্গুলগুলো কোন কিছু আঁকড়ে ধরার চেষ্টায় কেমন কুঁকড়ে ছিল। শরীরটার পাশে বসে থাকা এক শিশু, কেবল বসতে শেখা এক শিশু তারস্বরে কাঁদতে কাঁদতে তাকায় ঠিক যেন আলমগীরের চোখের দিকে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে আলমগীর, শিশুটি তিন দিন ধরে এভাবেই কাঁদছে। খিদের কষ্টে কাঁদছে। মা কেন ওকে কাছে টেনে নিচ্ছে না, সেই কষ্টে কাঁদছে।
আলমগীর চোখ ফেটে বের হওয়া পানিতে হাহাকার মিশিয়ে নিজেকেই ধমকায়, মায়ের মরে যাওয়া শরীরের গন্ধ এভাবে ভুলে যায় কেউ? ও ভুলে গেলেও ওর মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষের কোন এক কোণায় ঠিকই লুকিয়ে ছিল গন্ধটা। ঠিকই ফিরে এসেছে পাজল মেলানোর দায়িত্ব নিয়ে।
শিশুরা ভাষা শেখার আগে অন্য মানুষের চোখের দৃষ্টি পড়ে নিতে শেখে। সেই শিশুটিও মায়ের চোখ চিনেছিল, আর চিনেছিল আর একজন মানুষের চোখ। আলমগীর সেই মানুষটির চোখে চোখ রেখে পাজ্ল মিলিয়ে নেয়। আর তখন হানিফ মিয়া ভয় পায়। ছটফট করে ওঠে। কেননা, তীব্র এক গন্ধ ধেয়ে এসেছে এই মাত্র, ঠিক ওর দিকেই।
মর্গের দরজাটা কিন্তু তখনো বন্ধ ছিল। তখনো।
কুবাস
নাসরীন মুস্তাফা
মিটিঙের মাঝখানে, সবার সামনে, টেবিল ভাসিয়েই ওয়াক্ করে বমি করে দেয় আলমগীর।
মহাপরিচালক মহোদয় তখন কেবল মাত্র ত্রৈমাসিক কর্মপরিকল্পনার তিনটি ধাপ শেষ করেছেন। তিনিই বলেছিলেন, মিটিঙে দেওয়া নাস্তা খেতে খেতেই সবাই কথা শুনতে পারবেন। সবাই সমুচা-মিস্টি আর পেয়ারায় যার যার মতো কামড় দিয়ে যথাসাধ্য কম শব্দ করার চেষ্টা করে চিবুচ্ছিল। আলমগীরও। পানি খেয়েছিল। এরপর চায়ের স্বাদ নেবে বলে হাত বাড়ালো কাপের দিকে। আর তখনি ঘটে গেল ঘটনাটা। টেবিল ভাসিয়ে ওয়াক্ করে বমি!
মহাপরিচালক মহোদয় কয়েক সেকেন্ড থেমেই আবার কথা বলতে থাকেন। আলমগীর অত্যন্ত বিব্রত ভঙ্গীতে টেবিল থেকে উঠে ছুট দেয় ওয়াশরুমের বেসিনের দিকে। অনেক অনেক বমি করতে হবে ওকে। করলোও তাই। অনেক অনেক বমি করার পর খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘেমে নেয়ে ওয়াশ রুমের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শ্বাস নিতে থাকে। চারিদিকে বমির গন্ধ টের পাচ্ছে। তা পাক্। বমির গন্ধও অনেক ভাল। একটু আগে ওর নাক যে গন্ধ পেয়েছিল, তা সহ্য করা যায় না। বর্ণনা করাও সম্ভব নয় ওর পক্ষে।
অফিস থেকে আধা বেলা ছুটি মিলে গেল। কলিগরা এক একজন একেক রকমের পরামর্শ দিচ্ছিল। আলমগীর কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। খুব দুর্বল লাগছিল ওর। বেরিয়ে আসার সময় জেনারেল সার্ভিস বিভাগের মোহিত ভাইয়ের কাছে না গিয়ে পারলো না। অফিসের গাড়ি-কার কি লাগবে-পুরো অফিস কিভাবে সাফ সুতরো রাখতে হবে, এসব দেখভাল করে মোহিত ভাই। খুব নীচু স্বরে মোহিত ভাইকে বললো, মিটিঙ রুমে ভাল করে হারপিক-ফারপিক ছেটানো দরকার ভাই। বাজে গন্ধ লেগেছিল নাকে। বমি এসে যাওয়ার মতো বাজে গন্ধ।
যে কোন মিটিঙের আগেই রুমটা আরেকবার ঝাড়পোছ করিয়ে সুগন্ধি এয়ারফ্রেশনার ছেটানোর সিস্টেম আছে অফিসের। মহাপরিচালক স্যার যদি মিটিঙে থাকেন, তবে নেওয়া হয় বাড়তি সতর্কতা। আজ সকালেও সেরকমটিই করা হয়েছিল। মোহিত ভাই নাকি নিজে গিয়ে যাচাই করেছেন। লেমন সুবাসের ফ্রেশনারের গন্ধ উড়ছিল ডানা মেলে দেওয়া গাঙচিলের মতো। মোহিত ভাই আলমগীরের পিঠে চাপড় মেরে বলে, মিয়া তুমি ফাইজলামি করো? বাজে গন্ধ নিশ্চয় তোমার মোজা থেকে এসেছিল।
না ভাই। ঐটা মোজার গন্ধ না। আমার মোজা তো নয়ই, আমার আশেপাশের কারোর মোজার গন্ধ না। অন্য কিছু।
অন্য কিছুটা কি?
জানি না। খুব বাজে।
মোহিত ভাই আবারো চাপড় মেরে একটু গম্ভীর হয়ে বলে, রাতে ঘুম হয়নি নিশ্চয়ই। যাও, বাসায় গিয়ে ঘুমাও। ঘুমের উপর ওষুধ নাই।
কথা সত্যি। কিন্তু আলমগীর গাঢ় ঘুমের ভেতর আবার সেই গন্ধটা পেয়ে ছটফট করে জেগে উঠলো। অবচেতন মন ওকে ছুটিয়ে নিয়ে গেল বেসিনের কাছে। ততক্ষণে বমি শুরু করেছে বলে মেঝে ভেসে গেল খানিক। তারপর বেসিন। কল ছেড়ে দিয়ে ও কেবলি ওয়াক্ ওয়াক্ করতে থাকলো।
আলমগীরের খুব কান্না পাচ্ছিল। অনেকক্ষণ ধরে বমি করে ওর বুক-পিঠ-পাঁজর যেন ভেঙ্গে যাচ্ছে। তবে কষ্টটা মনে হচ্ছে বমি না, গন্ধটা কেন পাচ্ছে সেই কষ্ট। ঘরের স্বাভাবিক গন্ধের বাইরে আর কোন গন্ধ নেই। আলমগীরও যে সব সময় পাচ্ছে, তা নয়। হঠাৎ ঘনিয়ে আসে, হাল্কা থেকে তারপর তীব্র হতে থাকে। তীব্র হতে হতে আরো তীব্র হয়। দম নিতে ইচ্ছে হয় না। নাক চেপে ধরে দেখেছে, গন্ধটা নাক ছাড়াই কেমন করে যেন মাথার ভেতর ঢুকে যায়। তারপর ছড়িয়ে পড়ে মাথার ভেতরেই। বমি করে ও আসলে মাথার ভেতর থেকে গন্ধটাকে টেনে বের করতে চায়। সেটা তো আর হয় না। পেট খালি হয় শুধু। গন্ধটা নিজে থেকেই এক সময় ছেড়ে দেয় ওকে, হাল্কা হতে হতে মিলিয়ে যায়। তারপর চলে যায়। আলমগীর তখন কাঁদে। প্রথমে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। এখন কাঁদছে হাউমাউ করে।
অফিস-টফিস মাথায় উঠে গেল এরপর। গন্ধটা কখন শুরু হবে, এই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে বেচারা। গন্ধটা আসতে আসতে চিৎকার করতে থাকে, আমি মরে যাব। আমি আর বাঁচবো না।
সব শুনে মোহিত ভাই আলমগীরকে নামকরা এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। বদহজম তো বটেই, গ্যাস্ট্রিক-আলসারের ভাল চিকিৎসক বলে খুব সুনাম নাকি তার। সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় না। মোহিত ভাইয়ের বড় বোনের ভাশুর বলে বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টেই যাওয়া গেল।
এই ডাক্তার ওকে পাঠাল নাক-কান-গলার ডাক্তারের কাছে। নাকের সমস্যা আছে কি না, দেখা হ’ল। কোন সমস্যা নেই। অনেক সময় মাথায় টিউমার-ফিউমার হলে নাকি রোগী এমন গন্ধ পায়, যা আদতে নেই, এমন তথ্য জানিয়ে এই ডাক্তার রেফার করলেন মাথার ডাক্তারের কাছে। মাথা ব্যথা হয়? আর সব মানুষের মতো আলমগীরেরও মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা হয়। তবে এই গন্ধটা যখন পায়, তখন মাথা ব্যথা হয় না, কিছুই হয় না। বমি তো ও নিজে থেকে করে। শরীরের ডিফেন্স মেকানিজম ওকে দিয়ে বমি করায়।
মাথার ডাক্তার বলছিলেন, ফ্যান্টোসমিয়া নামে একটি সমস্যা আছে, যা মস্তিষ্কের কেন্দ্রে এমন ঝামেলা বাঁধায়, যাতে মস্তিষ্ক ধারনা করায়, গন্ধ পাচ্ছ তুমি। এই গন্ধের নাম ফ্যান্টম গন্ধ। যার পাওয়ার কথা, কেবল সে-ই পায়, তার সাথে থাকা আর কেউ পায় না। অথচ এই গন্ধ যে পাচ্ছে, তার ধারে কাছে নেই গন্ধের উৎস।
আলমগীরের পুরো মাথা স্ক্যান করেও কিছুই পাওয়া গেল না। এরপর পুরো শরীরেরও স্ক্যান করা হ’ল। কোথাও কোন সমস্যা নেই। থায়রয়েড ক্যান্সারের রোগি নাকি সিগারেটের গন্ধ পায়। আলমগীরের থায়রয়েড ক্যান্সার আছে কি না, সেটাও খুঁজে দেখ্ াহ’ল। ডায়াবেটিসের রোগির রক্তে শর্করার হার অনেক বেশি হয়ে গেলে নাকি কোন কিছু পুড়ে যাওয়ার গন্ধ পায়। আলমগীরের রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিক।
এলোপেথিতে কাজ হবে না জানিয়ে মোহিত ভাই ওকে হেমোপ্যাথির ডাক্তারের কাছেও নিল। ছোট বড়ি, বড় বড়ি, সাদা তরল, লাল তরল, অনেক রকমের ছোট ছোট কাঁচের বোতল সাফ করে দিয়েও কোন কাজ হ’ল না। রিসেপশনিস্ট রীতার পরামর্শে কবিরাজিও বাদ যায়নি। নাহ্, গন্ধটা রেহাই দেয়নি ওকে। বমি তাই করতেই হয়। শুকিয়ে হাড্ডি হয়ে যাওয়া আলমগীরের চোখ ঢুকে গেছে গর্তের ভেতর, চোখের নিচে কালি পড়েছে, চোয়াল তোবড়ানো। কয় কেজি ওজন কমে গেছে, সেই হিসাব করা ছেড়ে দিয়েছে ও। কেননা, এতে কোন লাভ নেই। ওজন কমতে কমতে ও বোধহয় একদিন হাত থেকে ছুটে যাওয়া বেলুনের মতো উড়ে যাবে আকাশে। উড়ে যাওয়ার আগে বাড়িতে খবর দেওয়া উচিত। মা মরে যাওয়ার পর বাপটা আবার বিয়ে করেছিল আলমগীরের দেখভাল করার যুক্তি দেখিয়ে, তবে সেই মা আলমগীরকে যে দেখভাল করতো, তার যন্ত্রনায় আলমগীরকে বাধ্য হয়ে এতিমখানায় যেতে হয়। যেভাবেই হোক, বড় হয়েছে, একলা একা জীবনে ভালই ছিল। চাকরি পেয়ে ভাবছিল বিয়ে করবে। সেই গানটাও শিখেছিল। বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে; বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে, সই গো!
ফুলের গন্ধ মানে ভাল গন্ধ। সুবাস। আলমগীর সুবাস পায়, তবে তা আর মন টানে না। কুবাসের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকা আলমগীর কেবলি ভাবে, কীসের গন্ধ পাই আমি?
গন্ধটার বর্ণনা দিতে গিয়ে ও কোন কিছু নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না। কখনো মনে হয়, গরম পেশাবের সাথে পচে যাওয়া ভিনিগার মেশানো। কখনো মনে হয় পচা কমলার সাথে বাসিপচা কাঁচা মাংস, উপরে দারুচিনি গুঁড়া ছড়িয়ে দেওয়া। অচেনা গন্ধটাকে চেনার জন্য ও নানা গন্ধের কাছে যায়। ডাস্টবিনের ময়লা ঘাঁটে। ড্রেনের পচা পানির কাছে নেয় নাক। মাছ বাজারে পচা মাছের গন্ধ শুঁকতে গিয়েছিল। ওর কান্ড দেখে মাছওয়ালারা মাছের পানি ছুঁড়ে মেরেছিল গায়ে। একজন তো বলেই বসলো, পচা বাস ভাল্লাগলে মইরা ভুত হইয়া যাওয়া মড়ার কাছে যা ব্যাটা!
আলমগীর তা-ই করেছিল। মোহিত ভাইয়ের বড় বোনের ভাশুরের প্রভাব খাটিয়ে হাসপাতালের মর্গে যায় ও। সাথে ছিল মোহিত ভাই আর ওর বাবা হানিফ মিয়া। ছেলের খবর শুনে ব্যবসাপাতি ছেড়ে আসা মানুষটার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। লাভ খুব ভাল বোঝে সে। লোকসানের ভেতর কখনো ছিল না। আজ কেন থাকবে?
দরজাটা বন্ধ। সেই বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়ানো আলমগীরের মাথার ভেতরে কে যেন বলে ওঠে, এখানেই আছে সেই গন্ধটা। মৃত্যুর গন্ধ। শরীরে পচন না ধরতেই যে গন্ধটা আঁকড়ে ধরে মরা মানুষের স্থির শরীরটাকে, আলমগীরের মাথার ভেতরে বাস করে ঠিক সেই গন্ধটাই। শরীরটা পচন ধরতে ধরতে ওর মাথায় ভরে যায় তীব্র গন্ধ, শরীরটা কেউ যখন দয়া করে দূরে সরিয়ে নেয়, তখনি যেন ওর মুক্তি মেলে গন্ধ থেকে।
গন্ধটাকে চিনতে পেরেই আলমগীর টের পায়, মাথার ভেতরে শুরু হয়েছে পুরনো দিনের এক সাদা কালো চলচ্চিত্র। মাটিতে পড়ে থাকা এক নারীর শরীরে হাতের আঙ্গুলগুলো কোন কিছু আঁকড়ে ধরার চেষ্টায় কেমন কুঁকড়ে ছিল। শরীরটার পাশে বসে থাকা এক শিশু, কেবল বসতে শেখা এক শিশু তারস্বরে কাঁদতে কাঁদতে তাকায় ঠিক যেন আলমগীরের চোখের দিকে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে আলমগীর, শিশুটি তিন দিন ধরে এভাবেই কাঁদছে। খিদের কষ্টে কাঁদছে। মা কেন ওকে কাছে টেনে নিচ্ছে না, সেই কষ্টে কাঁদছে।
আলমগীর চোখ ফেটে বের হওয়া পানিতে হাহাকার মিশিয়ে নিজেকেই ধমকায়, মায়ের মরে যাওয়া শরীরের গন্ধ এভাবে ভুলে যায় কেউ? ও ভুলে গেলেও ওর মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষের কোন এক কোণায় ঠিকই লুকিয়ে ছিল গন্ধটা। ঠিকই ফিরে এসেছে পাজল মেলানোর দায়িত্ব নিয়ে।
শিশুরা ভাষা শেখার আগে অন্য মানুষের চোখের দৃষ্টি পড়ে নিতে শেখে। সেই শিশুটিও মায়ের চোখ চিনেছিল, আর চিনেছিল আর একজন মানুষের চোখ। আলমগীর সেই মানুষটির চোখে চোখ রেখে পাজ্ল মিলিয়ে নেয়। আর তখন হানিফ মিয়া ভয় পায়। ছটফট করে ওঠে। কেননা, তীব্র এক গন্ধ ধেয়ে এসেছে এই মাত্র, ঠিক ওর দিকেই।
মর্গের দরজাটা কিন্তু তখনো বন্ধ ছিল। তখনো।


0 Comments