মরীচিকা-ছোট গল্প
মরীচিকা,,
মোঃ তোফায়েল হোসেন,,
আঁখির সাথে তার প্রথম দেখা এক চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে। দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ব্যাংকের শাখায় যাওয়ার জন্য যখন সিঁড়ি ভাঙ্গছে ঠিক তখন হঠাৎ হুড়মুড় করে তার উপর এসে পড়ল এক রূপসী ষোড়সী যুবতী। যুবক তো কিংকর্তব্যবিমূঢ় আবার ভয়েও আড়ষ্ট; না জানি মেয়েটি কী বলে বসে। যদিও ঘটনার জন্য সে দায়ী নয়, তবুও ঝগড়ার ব্যাপারে এ সম্প্রদায়কে বরাবরই ভয় করে।
যাক, মেয়েটি নিজেকে দ্রুত সামলে নিল। হরিণীর চোখে তার পানে গভীরভাবে চেয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর মন ভোলানো একটা হাসি দিয়ে দ্রুত চলে গেল। যুবক আর কী করবে। ঘটনাকে একটা অঘটন ভেবে চলে এলো সেখান থেকে।
পরদিন গোধূলী বেলায় নিঃসঙ্গ মানুষটা একা একা ইট পাথরের শহরে ব্যস্ত ফুটপাত ধরে আনমনে হাঁটছে। রাজমহলের সামনে যেতেই তার জিব্বাটা নড়াচড়া শুরু করল। মিষ্টির প্রতি তার প্রচণ্ড দূর্বলতা। কোনোকিছু না ভেবেই ঢুকে পড়ল রাজমহলে। একটা চেয়ারে বসে ওয়ার্ডার দিল। প্রথম মিষ্টির অর্ধেক খাওয়া হয়নি এমন সময় হঠাৎ আতশীর মতো তার সামনে এসে উপস্থিত হলো গতকালের সেই চঞ্চলা। কোনো কথা না বলে জড়তাহীন ভাবে বসে পড়ল তার সামনের চেয়ারে। অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে ঘায়েল করতে লাগল তাকে। অতঃপর মেয়েটি কথা বলল- আমাকে কি অতিথি করবেন না? নিঃসঙ্গ যাযাবর যুবক ষোড়সীকে অতিথি বানালো; আপ্যায়ন করালো তার অতি প্রিয় মিষ্টি দিয়ে। বিল দিতে অনেক চেষ্টা করল মেয়েটি। কিন্তু যুবক তাকে কিছুতেই তা করতে না দিয়ে নিজে বিল পরিশোধ করল। তারপর রাজমহল থেকে বেরিয়েই দু’জন দু’দিকে।
পরদিন সাতসকালে মেয়েটি সরাসরি যুবকের মেসে উপস্থিত; হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট। প্যাকেটটি তার হাতে দিয়ে অশ্রুসজল চোখে বলল- ‘আমি কারও কাছে কোনো ঋণী থাকতে চাই না। অনেক ভেবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারলাম না। তাই মিষ্টির বদলে মিষ্টি দিয়ে একটা ঋণ শোধ করলাম। আর অন্য ঋণটা কিভাবে শোধ করব ভেবে পেলাম না। আপনি যদি চান সেই ঋণটা ক্ষমা করে দিতে পারেন। না হয় আমি যেভাবে আপনার বুকের উপর পড়েছিলাম সেভাবে আপনিও আমার বুকের উপর একবার পড়ে যেতে পারেন।’
বলে কী মেয়েটি! মাথা কি ঠিক আছে তার? অকূল সাগরে সাঁতার কাটছে যুবক। নিজেও জানে না কতক্ষণ পর তীরের দেখা পেল। কিন্তু যেখানে সে তীর ভেবে খুশিতে মেতে উঠল সেখানে আসলে তীর নয়, মরীচিকা সেই মেয়েটির হাওয়ায় ভেসে চলে যাওয়া একটা কাঠামো মাত্র। সেদিনের পর আঁখি তার কাছে আর কোনোদিন আসেনি। যুবক আনমনে আঁখিকে অনেক খুঁজেছে, তবুও তার দেখা আর পায়নি।
পাঁচ বছর পর- ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের এক রেস্তোরায় বসে নিঃসঙ্গ সেই যুবকটা অভুক্তের মতো মিষ্টি গিলছে। এমন সময় তার দৃষ্টি গেল রাস্তায়। দেখে সেদিনের চলে যাওয়া আঁখি একজোড়া বৃদ্ধ বৃদ্ধার সাথে ফুটপাত ধরে হাঁটছে। যুবক ভুলে গেল সবকিছু, থেমে গেল মিষ্টি গাঁথা চামচ। তারপর হঠাৎ খেয়াল হলো- তারা এ দিকেই আসছে। আর করিডোর পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই সে অবাক হলো। এতো আঁখি নয়, অন্য কেউ! তবে দু’টি মানুষের মধ্যে এত মিল সে আর আগে কখনো দেখেনি। একমাত্র ভিন দেশের বাসিন্দা বলেই আঁখি এবং এই মেয়েটাকে সে আলাদা করতে পেরেছে। এ মেয়েটার মধ্যে এ দেশের প্রভাব বিরাজ করছে। কিন্তু আঁখি ছিল সম্পূর্ণ বাঙ্গালী এক ললনা।
চোখ সরানো কোনোক্রমেই সম্ভব হচ্ছে না। এমন সময় তাকে দেখতে পেল মেয়েটি এবং মুহূর্তে মেয়েটির মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখা দিল। যেন বাতাসে ভেসে এলো যাযাবর যুবকের কাছে। তার এভাবে আসা দেখে যুবক দাঁড়িয়ে গেল এবং পুরোপুরি দাঁড়ানোর আগেই মেয়েটা তাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল যেন যুবককে তার বুকের পাজরের ভিতর ঢুকিয়ে দিতে চায়। যুবক কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না এই প্রবাসী যুবতীর এই কর্মকান্ডের অর্থ। প্রলাপ বকতে শুরু করল মেয়েটি। মেয়েটি বলছে- ‘কেন? কেন এভাবে আমাকে ছেড়ে চলে গেলে? তুমি কি বুঝ না, তোমাকে ছাড়া আমার বাঁচা অসম্ভব। এত নিষ্ঠুর হলে কিভাবে? ...আর আজ আবার তুমি মিষ্টি খাচ্ছো...।’
মেয়েটি তাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের প্রলাপ বকেই চলছে। এমন সময় একটা কোমল হাত নিঃসঙ্গ যুবকটার কাঁধ স্পর্শ করল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল অশ্রুসজল চোখে দাঁড়িয়ে আছেন সেই বৃদ্ধা। তার কাঁধে একটা মৃদু চাপ দিয়ে ভরসা শিরাতে ঢুকিয়ে দিলেন। বৃদ্ধের চোখও অশ্রুসজল। বৃদ্ধ যুবকের কানে মুখ নিয়ে আস্তে করে বললেন- ‘বাবা, আমি তোমাকে সবকিছু বলবো এবং তোমার কাছে চিরঋণী থাকব, যদি এ মুহূর্তে আমার মেয়েটিকে একটু শান্তনার বাণী শুনাও। আমার মেয়েটা মৃত প্রায়। একটি মৃত্যুমুখে পতিত মেয়েকে একটু সময় বেশি যদি পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখতে পারো, তবে সেই সময়টুকুর জন্য বিধাতা তোমাকে অনেক অনেক কিছু পাইয়ে দিবেন।’
মেয়েটি এখনো কাঁদছে আর প্রলাপ বকছে সেই নিঃসঙ্গ যুবকের বুকে মাথা রেখে। যুবক কি করবে ভেবে পায় না। এ ঘটনার সারমর্ম কী তাও বুঝে উঠতে পারছে না। তবুও বিবেকের তাড়নায় তাদের সাথে মেয়েটির বাসায় আসতে হলো। বাসায় আসার একটু পর মেয়েটি হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাদের পারিবারিক ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার মেয়েটির অচেতন দেহে ইনজেকশন পুশ করে বললেন- ‘অসুবিধে নেই, একটু ঘুম হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’’ ডাক্তারের প্রস্থানের পরপরই বৃদ্ধ যুবকের সাথে কথা বলতে লাগলেন। যুবকের পরিচয় জেনে নিয়ে তারপর এক করুণ কাহিনী শুনালেন, যার সারসংক্ষেপ হলো-
’আমার মেয়ে লিন্ডা ভালোবাসতো একটি ছেলেকে; যার চেহারা ছিল একদম তোমার মতো। লিন্ডাকেও প্রচন্ড ভালোবাসতো ছেলেটি। যার ফলস্বরূপ, দু’পরিবার তাদের বিয়ের কথাবার্তা পাকা করলাম এবং নির্ধারিত দিনে তাদের বিয়েও হয়ে গেল। লিন্ডা এবং তার স্বামী দু’জনেরই প্রচন্ড মিষ্টি প্রীতি ছিল। এই মিষ্টির কারণেই নাকি দু’জনের প্রথম দেখাতেই কথা এবং ভালোবাসা হয়। তাই তাদের এই বাসর স্মরণীয় করে রাখতে লিন্ডার স্বামী গোপনে এক প্যাকেট মিষ্টি এনে রাখে ঘরে। বাসর ঘরে ঢুকে প্রথমেই সে সেই মিষ্টির প্যাকেট বাহির করে এবং লিন্ডাকে বলে তাকে খাইয়ে দিতে। লিন্ডা তাকে একটা মিষ্টি খাইয়ে দিয়ে আবদার করে তাকেও যেন স্বামী মিষ্টি খাইয়ে দেয়। আবদারের সাড়া দিতে স্বামী পুরুষটি একটা মিষ্টি হাতে নেয় কিন্তু লিন্ডার মুখে তুলে দেওয়ার আগেই সে ঢলে পড়ে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সে আর ফিরে আসেনি লিন্ডার কাছে; ফিরে গেছে সৃষ্টিকর্তার কাছে। ডাক্তার জানিয়েছে বিষাক্ত কিছুর কারণে এই মৃত্যু। স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে লিন্ডাও তার মানসিক ভারসাম্য হারায়। সে এখনো বিশ্বাস করে তার স্বামী বেঁচে আছে। আজ তোমাকে দেখে আমিও প্রথমে চমকে গিয়েছিলাম। কিন্তু একটু খেয়াল করতেই লিন্ডার স্বামীর সাথে তোমার তফাৎ খুঁজে পাই। কিন্তু আমার মেয়েটির চোখে তা ধরা দেয়নি এবং দেবেও না। এখন তোমার কাছে অনুরোধ করবো- বাবা, আমার মেয়েটি এমনিতেই বেশি দিন বাঁচবে না। যদি সম্ভব হয় তাকে একটু সময় দাও। ডাক্তাররা ঘোষণা করে দিয়েছেন তার ব্রেন ক্যানসার হয়ে গেছে। তোমাকে পাওয়ার পর তার অনেক পরিবর্তন দেখছি। যদিও বাস্তব সত্য সে আর বেশি দিন বাঁচবে না, তবুও যতদিন বাঁচে তার মুখে হাসি দেখতে চাই। তুমিই একমাত্র সেই হাসির উৎস। যদি সম্ভব হয় এই ঋণীটা করে যাও আমাদের।‘’
যুবক পারেনি তাদেরকে ফেরাতে; বিশেষ করে সেই মেয়েটির কথা ভেবে। যুবককে সময় দিতে হলো। তাকে পেয়ে মেয়েটি যে চঞ্চলতায় নিজেকে ভাসাতে লাগলো তা দেখে নিঃসঙ্গ যুবক মৃত্যুটাকে পরোপুরি উপলব্ধী করতে পারল। মেয়েটির স্বামী হিসেবে অভিনয় করতে গিয়ে সে এমন এক পরিস্থিতিতে পড়ল, কূল কিনারা হারাতে লাগল। লিন্ডা তার স্বামীর কাছে স্বামীর পৌরুষত্ব চায়। কী করবে যুবক? না, সে পারবে না এ প্রতারণা করতে। অনেক চেষ্টায় লিন্ডাকে যখন থামানো যাচ্ছে না। তখন এক রাতে বিধাতা নিজেই তাকে থামিয়ে দিলেন। লিন্ডা চলে গেল না ফেরার দেশে। যাযাবর যুবকের সে রাতে আঁখিকে খুব বেশি মনে পড়ল। যুবক কাঁদল বুক ভাসিয়ে। কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারল না, এ কান্না কার জন্য- আঁখি না লিন্ডার?
এক বছর পর যুবক আবার নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করল। কিন্তু এ এক বছর সে না পারল লিন্ডাকে ভুলতে, না পারল আঁখিকে ভুলতে। আঁখি তো তার কাছ থেকে চলে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু লিন্ডা নামের এক হতভাগী আবার আঁখিকে পুনরায় তার মনে কেনই বা বসিয়ে দিল, তার কোনো উত্তর খুঁজে পেল না সে। বিষণ্ন একটা কষ্ট প্রতি মুহূর্তে তাকে তাড়াল অভূক্ত বাঘিনীর মতো।
দেশে ফেরার পনের দিন পর এক পূর্নিমা রাতে যুবক নিশাচরদের সাথী করে বেরিয়ে পড়লো পাড়ার রাস্তায়। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে রাত দ্বী-প্রহরের সময় সে একটা নষ্ট লাইট পোষ্টের নিচে বসে পড়ল। আর সেই মুহূর্তে একটা বিষ্ময় উপহার দিল উত্তাল ধরনীর এই পূর্ণিমা রাত। সে দেখল- বেওয়ারিশ কুকুর আর পঙ্গু ভিক্ষুকের সাথে রাত জাগা এক দেহ প্রসারিনী যুবতী একজন খদ্দর নিয়ে জ্যোৎস্নার আলো থেকে ডুব দিচ্ছে অন্ধকারে; টাকার বিনিময়ে আদিম খেলা খেলতে। যুবতীর ধূসর হাতে ছয় বছর পূর্বের আঁখির দেয়া সেই মিষ্টির প্যাকেটের অনুরূপ একটা প্যাকেট। যুবক অবাক হলো- একবার ভাবল এই দেহ প্রসারিনী আঁখি। পরক্ষণে তার মনে হলো আঁখি নয় এতো লিন্ডা।


0 Comments