বৃষ্টিপুকুর ব্যাঙছানা ও গ্যাঙর গ্যাঙ-ছোট গল্প
বৃষ্টিপুকুর ব্যাঙছানা ও গ্যাঙর গ্যাঙ,,
- জুয়েল আশরাফ,,
আষাঢ় মাস। ঘন বরষা। সোনাব্যাঙদের মজলিস বসেছে পুকুরঘাটে। সাথে আছে কুনোব্যাঙ ও তাদের ছানাপোনা। ভারি বর্ষণ হচ্ছে। বর্ষাকাল, রিমঝিম বৃষ্টি আর এদের গ্যাঙর গ্যাঙ ডাক। ছানাপোনাদের খুব আনন্দ। তারা পুকুরে লম্ফঝম্প করছে, পানিতে ভাসছে, সাঁতার কাটছে। সোনাব্যাঙের ছানাপোনারা এলো তাদের মায়ের কাছে। বলল, 'মা গল্প বলো। গল্প শুনব।'
মা-ব্যাঙের গ্যাঙর গ্যাঙ ডেকে গলার স্বচ্ছ চামড়ার থলি ফুলে ওঠেছিল। সে জিজ্ঞেস করে, 'আজ তোমরা কী গল্প শুনবে আমার ছানাপোনারা?'
ছানাপোনাদের একজন বলে উঠল, 'বিদেশি ব্যাঙদের কেচ্ছা-কাহিনি শুনব আজ।'
মা-ব্যাঙ বলল, 'ঠিক আছে, আজ তোমাদের শোনাব অন্য ব্যাঙদের কাহিনি।'
'মা, বিদেশে যেসব ব্যাঙ থাকে ওরা কি আমাদের মতো ডাকে?'
মা-ব্যাঙ হাসল। বলল, 'সেই সমস্ত ব্যাঙেদের কথা তাহলে শোনো- মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকাতে রেইন ফরেস্ট বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে এক ধরনের ব্যাঙ রয়েছে, মানুষ তাদের নাম দিয়েছে রেড-আইডট্রি ফ্রগ। কি সুন্দর নাম, তাই না?'
'আচ্ছা মা, মানুষ আমাদের ব্যাঙ বলে তাহলে বিদেশি ব্যাঙদের অন্য নাম রাখল কেন?'
মা-ব্যাঙ আবার হাসল। বলল, 'ওরা তো বিদেশি মানুষ, বিদেশি ব্যাঙ, বিদেশি ভাষা। তাই ভিন্ন ভিন্ন নাম।'
ছানাপোনাদের একজন কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, 'ওরা দেখতে কেমন? আমাদের মতো?'
'দেখতে একেবারে গোবেচারা। ছোট্টোখাট্টো চেহারা। ছেলে ব্যাঙ মাত্র আড়াই ইঞ্চি লম্বা। মেয়ে ব্যাঙ একটু বেশি লম্বা। এই ব্যাঙ গেছো। মানে গাছে গাছে থাকে। এদের দেখতে খুব সুন্দর। চোখের মণি লাল, বড়ো বড়ো চোখ এদের। শরীরে নানা ধরনের রঙের বাহার যেমন- হলুদ, লাল, সবুজ, কমলা প্রভৃতির মিশ্রণ। দক্ষিণ আমেরিকার বড়ো বড়ো গাছ হলো এদের আশ্রয়স্থল।'
'ব্যাঙেদের আরও গল্প বলো।'
'বলছি, এখন শোনো আর্জেন্টিনায় ব্যাঙেদের কথা। এরা বাস করে পাইন গাছে। এরাও গেছো ব্যাঙ। চকচকে ঝকঝকে চেহারা। এই ব্যাঙ ঠিক আমাদের সোনাব্যাঙ এর মতন দেখতে। চোখের দুই পাশটা একটু উঁচু যা আমাদের সোনাব্যাঙের নেই। এদের দাঁত আছে, যা বেশ ধারালো। সেই দেশের মানুষেরা এদের বলে থাকে যমদূত।'
'তারপর?'
'এখন শোনো রানিডা ট্র ফ্রগস এর গল্প, এই ব্যাঙ অস্ট্র্রেলিয়া বাদে সারা পৃথিবীতে দেখা যায়। এরা বিভিন্ন রঙের হয়। এরা দারুণ লংজাম্প দিতে পারে। শরীরের তুলনায় এদের চোখ বেশ বড়ো হয়। এদের গায়ের রং এরা ইচ্ছা অনুযায়ী পাল্টাতে পারে। নিয়মিত খোলস ছাড়ে। অবাক কান্ড, এরা আবার সেই খোলস খেয়েও নেয়!'
ছানাপোনাদের মুখ হা হয়ে গেল শুনে। মা-ব্যাঙ বলতে থাকে, 'দক্ষিণ আফ্রিকার মরুভূমি অঞ্চলে বাস করে এক ধরনের ব্যাঙ। অবিকল ফুটবলের মতন চেহারা। সারাবছর মাটির নিচে বসবাস করে এরা। শুধু বৃষ্টির সময় এরা মাটির উপরে উঠে আসে। কি আশ্চর্য ধরনের ব্যাঙ এই "ব্ল্যাসপ"। এরাই হলো সেই ব্যাঙ যারা ডাইনোসরের যুগে ডাইনোসরের বাচ্চাদেরকে টপাটপ করে গিলে খেতো। এরা হলো "ডাইনোসর গেলা" ব্যাঙ। প্রায় সাত কোটি বছর আগে এই ব্যাঙেরা ঘুরে বেড়াতো।'
ছানাপোনাদের চক্ষু চড়কগাছ। মা-ব্যাঙ বলল, 'সবচেয়ে বিষাক্ত ব্যাঙ হল কোকাই। এই ব্যাঙের শরীরে যে পরিমাণ বিষ থাকে তাতে পনেরোশো থেকে দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এরা ডেনড্রোবেট গোত্রের ব্যাঙ। এদের বিষ থাকে চামড়ার ভিতর। এরা বাস করে পশ্চিম কলম্বিয়া আর দক্ষিণ আমেরিকাতে।'
ছানাপোনারা হতবাক। বিশ্বের এত এত ব্যাঙের খবর তারা কোনদিন জানতো না। তাদের মা পড়াশুনা করে জেনেছে। ঠিকমত পড়ালেখা করলে তারাও জানতে পারবে অনেক কিছু।
মা-ব্যাঙ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'আমরা ব্যাঙেরা এদেশের মানুষের কোনো ক্ষতি করি না, বরং তাদের খেত-খামারের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে উপকার করি। বর্ষাকালে আমরা সমবেত হয়ে গলা ফুলিয়ে ডেকে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করি। শোনাই আমাদের ব্যাঙ-সঙ্গীত। বিনিময়ে এদেশের মানুষ টাকার বিনিময়ে আমাদের বিক্রি করে দেয় বিদেশে। মানুষগুলো খুব স্বার্থপর।'
ছানাপোনারা সমস্বরে বলে উঠল, 'ঠিক কথা ঠিক কথা মানুষ স্বার্থপর।'
অন্যান্য ব্যাঙেরা চলে এসেছে। তারাও বলে উঠে, 'একদম হক কথা বলছো।'
'আসো আমরা কিছুক্ষণ আমাদের সঙ্গীত চর্চা করি।' সমস্ত ব্যাঙ পুকুরে দিল ঝাপ। আর শুরু হলো সঙ্গীত, 'গ্যাঙর গ্যাঙ গ্যাঙর গ্যাঙ গ্যাঙর গ্যাঙ...।'


0 Comments