অমি’র ইচ্ছেপূরণ-ছোট গল্প
অমি’র ইচ্ছেপূরণ,,
মোহাম্মদ অংকন,,
আষাঢ় ও শ্রাবণ দুই মাস নিয়ে বর্ষাকাল। অমি এটি বেশ ভালো করে জানে। সে তার ‘ষড়ঋতু’র বইয়ে পড়েছে। কিন্তু কখনও সে বর্ষা দেখেনি। আর দেখবে কী করে! সে তো থাকে শহরে। শহরে বর্ষাকাল কী, তা বোঝা যায় না। তবে অলিতেগলিতে জলাবদ্ধতা দেখে স্কুলে যাওয়ার পথে অমি তার আম্মুকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, ‘আম্মু, এটাই কি বর্ষা?’ আম্মু অকপটে ‘হ্যাঁ’ বলে দেয়।
স্কুলের সময় ছাড়া অমি’র ঘরেই কাটে। টিভি দেখে, গেম খেলে, হোমওয়ার্ক করে, ড্রয়িং করে। আরও অনেক কিছু করে। আম্মুর সাথে বিকেলে পার্কে ঘুরতে যায় মাঝেমধ্যে। বৃষ্টি হলে কখনও বাহিরে যাওয়া হয় না। আর তাই সে কখনও বৃষ্টিতে ভিজতে পারেনি। তবে অমি’র অনেক দিনের ইচ্ছে, সে বৃষ্টিতে ভিজবে। ক’দিন আগেও তার নানুকে মোবাইলে বলল, ‘নানু, আমি বৃষ্টিতে ভিজতে চাই। গ্রামে বৃষ্টি এলে তুমি কি আমায় ভিজতে দিবে?’
অমি’র আব্বু অফিস করেন। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে প্রায়ই বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় ফেরেন। অমি জিজ্ঞেস করে, ‘আব্বু, তুমি রোজ রোজ ভিজে আসো কেন?’
‘অমি আম্মু, এখন তো বর্ষাকাল চলছে। যখন তখন বৃষ্টি নামে। তাই ভিজে যাই।’
‘ইশ, আব্বু! স্কুল থেকে ফেরার পথে আমি যদি বৃষ্টিতে ভিজতে পারতাম!’
‘না আম্মু, অমন কথা বলতে নেই। বৃষ্টির পানি মাথায় পড়লে জ্বর-সর্দি-কাশি হতে পারে। তখন স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।’
আম্মু-আব্বু যতই নিষেধ করুক না কেন অমি’র বহুদিনের ইচ্ছে সে বৃষ্টিতে ভিজবে। তাই তো ক্যালেন্ডারের পাতা খুঁজতে থাকে কবে শুরু হবে বর্ষাকাল আর কবে আসবে তার জন্মদিন। সে জন্মদিনে অনেক অনেক গিফট পায়। আম্মু-আব্বু তার সব ইচ্ছে পূরণ করে দেয়। লাল-নীল ড্রেস কিনে দেয়। খেলনা-গাড়ি কিনে দেয়। অমি ভাবে, ‘আমার সব ইচ্ছেই তো পূরণ হয়; শুধু বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছে পূরণ হয় না।’
অমি’র এবার আটতম জন্মদিন। একে তো বর্ষাকাল চলছে, তার ওপরে দিনটা ছুটির দিনে পড়ে যায়। নেই স্কুল, নেই তার বাবার অফিস। অমি’র আব্বু-আম্মু সব আয়োজন করে। কিন্তু অমি মনটা খারাপ করে সোফায় বসে থাকে। অমিকে আব্বু দেখে বলেন, ‘অমি আম্মু, জম্মদিনে তোমার মনটা খারাপ কেন?’
‘আমার মন খারাপ এইজন্য যে আকাশেরও আজ মন খারাপ।’
‘ও আচ্ছা! আকাশ যে কাঁদছে, তাহলে তুমিও কাঁদো।’
‘আব্বু, আমি সত্যি সত্যি কান্না করে দিব আজ।’
‘না আম্মু, জন্মদিনে কান্না করতে নেই। বল, তোমার মন ভালো করতে আমায় কী করতে হবে?’
‘আমার ইচ্ছেপূরণ করে দিতে হবে।’
‘কীসের ইচ্ছে, আম্মু?’
‘আমি আজ বৃষ্টিতে ভিজব। নইলে জন্মদিন পালন করব না। বসে বসে কাঁদব। মেহমানদের সাথে কথা বলব না একদম। তখন মজা বুঝবে।’
অমি’র এমন জিদের কথা শুনে তার আব্বু একটু থমকে যান। ছোট্ট মেয়েটিকে বৃষ্টিতে ভিজতে দিলে যদি অসুখ-বিসুখ হয়! অমি’র আম্মুর সাথে এ নিয়ে কথা বলে। অতঃপর তারা দুজন ডাক্তারের সাথে কথা বলেন। ডাক্তার জানান, ‘বৃষ্টিতে সামান্য সময় ভিজলে তেমন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে পা পিঁছলে পড়ে যাওয়া থেকে সাবধান থাকতে হবে।’
অমি’র আব্বু-আম্মু ডাক্তারের পরামর্শ শুনে অমি’কে নিয়ে বাসার ছাঁদে চলে যায়। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল তখন। আর অমি’কে বলে, ‘যাও তুমি বৃষ্টিতে ভিজো।’
অমি ছাদে ঘুরে ঘুরে হাঁটে আর বৃষ্টিতে ভিজে। বাবা মাঝেমধ্যে ছাতা এনে ধরে।
‘আব্বু, ছাতা ধরলে কি আর বৃষ্টিতে ভেজা হল?’
বর্ষাকালের ঝুম বৃষ্টিতে অমি ভিজতে থাকে। ভিজতে ভিজতে নাচতে থাকে। নাচতে নাচতে ভেজা শহরের বুকে সে চিৎকার করে জানিয়ে দেয়, ‘হুর রে! আজকে আমার ইচ্ছেপূরণ হয়েছে।’


0 Comments