করোনাকালের দিনরাত-ছোট গল্প

by - July 28, 2020


করোনাকালের দিনরাত,,

             - জুয়েল আশরাফ,,
         - জুয়েল আশরাফ,, 

দুপুর থেকে একটা খবর নূরুলপুর গ্রামবাসীর মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গ্রামের মানুষ দরজা বন্ধ করে ঘরে চুপ মেরে আছে। নূরী সাত মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা। শাশুড়ি আর ননদ ঘরে কাঁদছে। তারও ইচ্ছে হচ্ছিল চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু স্বামীর কথায় মনে পড়ে গেল, 'করোনা ভাইরাস আমাগো মতোন গরীব মানুষরে আক্রমন করব না। বুকে বল রাখো। না হলে বনের বাঘের চেয়ে মনের বাঘেই আগে খেয়ে নেবে।' স্বামীর কথাগুলো নূরী ভাবে আর গোপনে চোখের পানি ফেলে।
একটু আগে বাড়ির পাশ দিয়ে গ্রামের লোকজন কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল। লোকজনের মধ্যে দোকানদার পান্নু, আকবর চাচা, মসজিদের ইমাম সাহেবও ছিলেন। আলোচনা হচ্ছিল গ্রামের রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ প্রসঙ্গে। লাশের কাছে যাওয়ার কারোর সাহস হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেয়া হয়েছে। তারা এসে লাশের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। লাশটি যে কার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষটি যে কোথায় থেকে এসে এখানে পড়ে মরল কেউ জানে না। শুধু খবর রটেছে- লোকটি মারা যাওয়ার আগে পানি খেতে চেয়েছিল। তার সাথে মোটরবাইক ছিল। পানি আনতে আনতেই দেখা গেল লাশ হয়ে পড়ে আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে এই গ্রামের ২৪ টি ঘর লকডাউন করে গেছে। ইমাম সাহেব দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বললেন, 'আল্লাহ রব্বুল আলামিনন যার যেখানে মৃত্যু রেখেছেন সেখানেই তার ইহলিলা সাঙ্গ হয়।' বাঁশের বেড়ার সাথে দাঁড়িয়ে নূরী কথাগুলি শুনছিল। সে কান খাড়া করে আছে লাশটি কার শুনতে। তার স্বামী পেটের দায়ে কাজের সন্ধানে বের হয়েছে। এরকম খিদে পেট নিয়ে কত মানুষ যে গৃহবন্দী হয়ে আছে সে খবর কে জানে! কাল এ গ্রামেরই দু'জন রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে পুলিশের মার খেয়ে ফিরে এসেছে। রাস্তায় বের হওয়া এখন একেবারেই বারণ। অকারণে কাউকে রাস্তায় পাওয়া গেলেই জেল-জরিমানা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠিন সতর্কবাণী। অল্প পর পরই তারা মাইকিং করে যাচ্ছে, 'আমাদেরকে কঠোর হতে বাধ্য করবেন না। সবাই যার যার ঘরে থাকুন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন।' 
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশের লোকদের কল্যাণের জন্যই দিনরাত মানুষকে ঘরে থাকার মধ্যেই নিরাপদ ঘোষণা করে যাচ্ছে।
কাজের সন্ধানে স্বামী কোথায় গেছে জানে না নূরী। সকাল নয়টা বাজতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাস্তাঘাটে টহল দিতে শুরু করে। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আজ তাই খুব ভোর-সকালে কাজে বেরিয়ে গেল। রাস্তায় লাশটা কার সঠিক না জানা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছে না নূরী। আর তাই তো বাঁশের বেড়ার দেয়ালে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে থাকে।
শাশুড়ির ডাক কানে এলো, 'ও বউ, পোয়াতি মেয়ে তুমি। সাঝের বেলায় চুল ছেড়ে অমন বাইরে থাকে না। ঘরে আইসা বসো। আনোয়ারকে কত করে বললাম দেশের অবস্থা ভালা না, এখন বাইরে যাইয়া কাজ নাই। কখন করোনার বাতাস কার গায়ে লাগব! কে শুনে কার কথা। পোলাটা আমার কই গেল আল্লাহ মাবুদ জানে!'
নূরীর গলা বুজে আসছে। অসহায় আর্তচিৎকার বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। সে নিজের ঘরে এসে বসল। নিজেকে যত সহজ আর স্বাভাবিক রাখা যায় সেই চেষ্টা চলতে থাকে ভেতরে ভেতরে। আচ্ছা রাস্তার লাশটা যদি তার স্বামীর লাশ হয়, কেউ এসে যদি এমনই এক মৃত্যু সংবাদ দেয়? এরকম সংবাদে সে কি স্বামীর লাশ ছুঁতে পারবে? করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পাশের গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যু হয়েছে। তাকে কবর দেয়া হয়েছে দশ কিলোমিটার দূরে। লোকজন মরদেহের ধারেকাছে ভিড়তে পারেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মে দাফন করা হয়েছে। সে-ও নিজের স্বামীর লাশ দেখতে পাবে না!
নূরী আশ্চর্য হয়, এসব সে কী ভাবছে! তার পেটে সাত মাসের শিশু। শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখার জন্য প্রতিনিয়ত জানান দিচ্ছে। গর্ভাবস্থায় মানুষের ভেতরে ভয় ডর আশাহত ব্যাপারগুলি খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করে। তাকেও অহেতুক ভীতি আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আর অযথা ভাববে না নূরী। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে ঢুকল চাপকল ঘরে। চাপকলের পানি নিল চোখে মুখে। ছড় ছড় পানির শব্দের সঙ্গে কাঁদল কিছুক্ষণ অকারণেই। এরপর নিজের ঘরে এলো। উঠোনে কার পায়ে হেঁটে আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে। শব্দটা খুব স্পষ্ট হয়ে ঘরের দিকে আসছে। স্বামী আনোয়ারের হাঁটার শব্দ নূরী চেনে। দাঁড়িয়ে আছে নূরী চেহারায় অসুখী ভাব চলে গিয়ে ধীরে ধীরে সুখী ভাব চলে আসছে।
please Follow & Share 

world books collect
join us on- telegram

You May Also Like

0 Comments