কিডন্যাপার-ছোট গল্প

by - July 28, 2020


কিডন্যাপার,,

খায়রুল আলম রাজু ,, 
কিডন্যাপার,,
খায়রুল আলম রাজু  ,, 

গতকাল একটি ই-মেইল এলো।যাতে লেখা ছিল— প্রিয় রাজু, আশা করি ভালো আছ। তোমাকে কতবার বললাম; ঢাকায় এসে— বেড়িয়ে যাও। কিন্তু না, তুমি আসোনি।তবে এবছর কথা ছিল আসার।বইমেলায় তুমি আসবে বলেছিলে। কবে আসছ?আচ্ছা সত্যি  আসছ কি?... কতকিছুই ভেবে রেখেছি, তুমি আসলে আমরা ঘুরবো; পার্কে, জাদুঘরে, বইমেলায়... আর যদি না আসো, তবে আর তোমাকে নতুন বই পাঠাচ্ছি না। এবছর কত গোয়েন্দা গল্প বেরিয়েছে মেলায়।পড়তে হলে,চলে এসো।  আর লিখছি না। আসলেই কথা হবে। অপেক্ষায় আছি।...  

ইতি, 
তোমার মাহমুদ ভাইয়া। 
খিলগাঁও, ঢাকা।       

দু-দুবার ই-মেইলটা পড়েছি। উত্তর লিখিনি। শেষমেশ  ঠিক করলাম ঢাকা যাব। কাপড়চোপড় ঘুচিয়ে নিলাম।পরদিনই  বিকেল দুইটার ট্রেনে ঢাকা যাচ্ছি ।স্টেশন এসে হঠাৎ মনে পড়লো ভাইয়ার কথা, দু'বছর আগে ভাইয়া বলছিলেন সিলেটের বিখ্যাত সাতকড়া খাবেন।সাতকড়া দেখতে লেবুর মতো—তবে আকারে বেশ বড়। সাতকড়া মিশিয়ে গরুর মাংসের তরকারি রান্না হলে—বেশ মজা; ডালের কথা না-ই বললাম। কিন্তু পাঠাবো, পাঠাবো বলে আর পাঠানোটাই হয়ে ওঠেনি।তক্ষুণি চোখে পড়লো একটি সবজি দোকান।পাশেই সাতকড়া রাখা। কিন্তু ওগুলো সাতকড়া তো? তিতকড়া হলে সমস্যা; না, দেখতে হবে।এজন্য পানি চাই, পরীক্ষা করবো।আর  তখনি চোখে পড়লো দোকানির বালতিটায় পানি রাখা।সাতকড়ার একটা বিশেষ গুণ আছে, ওটা সাতকড়া হলে  ভেসে ওঠে, তিতকড়া হলে ডুবে যায়!ছয়টি সাতকড়া বালতিটায় রাখতেই ভেসে উঠলো তিনটি। পরের বার দু'টো; ভেসে উঠল একটি। দরকষাকষিতে  দু'শো টাকায় কিনে নিলাম  —একখালি ( চারটি )।কাঁধে রাখা ব্যাগটার সঙ্গী হলো সাতকড়ার ব্যাগটা। ব্যাগ দু'টোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে  অংক কষছি সাতকড়ার। দু'টো দিদামণির, দু'টো ভাইয়ার। ওদিকে ট্রেন আসতেই ওঠে পড়লাম। ঠিক বিকেল দুইটায় ট্রেন ছাড়ল। ঝকঝক শব্দে ঢাকায় এগুচ্ছে সে। কি দারুণ দৃশ্য! দুপাশে গাছ, ঘন বন, ধানক্ষেত, কখনো নদী-পাহাড় কিংবা গ্রাম পিছনে ফেলে-ফেলে ছুটছে...—ট্রেন।এটাই আমার একা ঢাকায় যাওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতা। পৌঁছাতে-পৌঁছাতে চার-পাঁচ ঘন্টা সময় লাগবে; বই পড়ে, ঘুমিয়ে আর টুকটাক লেখালেখিতে সময়টা পেরিয়ে চলল।কখন যে সাতকড়া রাখা ব্যাগটা চুরি হলো বুঝতেই পারিনি।ভেবেও কাজ হবে না। ব্যাগটা হয়তো টঙ্গী স্টেশনেই চুরি হলো।তখন তো ঘুমিয়ে ছিলাম। উত্তরা ছেড়ে  ট্রেন কমলাপুর পৌঁছে।আমি নেমে পড়লাম।রিকশা চড়ে সোজা দিদামণির বাসায়।সুন্দর শুনশান নীরবতা  আর শান্ত নিরিবিলি জায়গায় বাসাটি চারতলা। তবে উপর তলার কাজ চলছে।  পাঁচতলা বললেও ভুল হবে না।রিকশা থেকে নেমেই দেখি, গেইটের সামনে দিদামণি  দাঁড়িয়ে।আমি কাছে এসে সালাম করে জরিয়ে ধরলাম।বাসায় ঢুকতেই শুরু হলো গল্পের ফুলঝুরি। কত কথা যেনে জমে আছে, কত গল্প যেন অলস পড়ে ছিল মনের কোণায়।বলেও শেষ হবে না; রাত ফুরিয়ে যাবে ঠিকই। ঠিক তখনি দাদু বাসায় এলেন, আমাকে দেখেই জড়িয়ে নিলেন বাহুডোরে। তারপর কত কথা খাবার টেবিলে...শিশির আঙ্কেল আগে খাবার শেষ করলেন সাথে দাদুও। কিন্তু আমি টেবিলেই খাচ্ছি ছোট চড়ুইয়ের মতো—দিদামণি বললেন।শুনে লজ্জা হলো! কিন্তু অভ্যেস যে ধীরে খাওয়াটা। কুড়ি মিনিট পর টেবিল ছেড়ে উঠলাম। দিদামণি ঘুমাতে যাওয়ার জন্য তাগিদ দিচ্ছেন। রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম রাজধানীর চারতলা বাড়িটার তৃতীয় তলায়।সকালে সূর্যের আলোর কুসুম ছড়ানোর সাথে-সাথেই ঘুম ভাঙলো।হাত-মুখ ধুয়েমুছে খেতে বসলাম, “ আমি, দাদু ও দিদামণি।নাশতা খেয়েই বেড়িয়ে পড়লাম রিকশা করে , একটি পত্রিকা অফিসে।ওখান থেকে আমার  প্রকাশিত লেখার সম্মানী নিলাম।সে-কি আনন্দ! টুকটাক লেখালেখি যে, এতো আনন্দ দেবে ভাবিনি —কোনোদিন।দু'টো কবিতা, পাঁচটা ছড়া আর   পুরো পনের-বিশটা গল্পের সম্মানী।এতো আনন্দ হলো চাঁদটা বুঝি পেয়েই গেছি;  পৃথিবীও বুঝি হাতের মুঠোয়। আনন্দে মনের ভেতর জুড়ে খুশির বন্যা বইছে; সুখের ঝরণা ঝরছে—কলকলিয়ে...  এই আনন্দের সাথে যোগ হল নতুন আরও একটি আনন্দ,বিভাগীয়  সম্পাদক ভাইয়ার সাক্ষাতটি।প্রথমত  দেখাতেই যিনি বললেন, “রাজু, তুমি তো ভাই দারুণ  লিখ!—” এসো এসো, ক্যান্টিনে এসো,কফি খাই। জমিয়ে গল্প হবে—এসো... তা কোন ক্লাসে পড়ছ,রাজু?
“ এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ”বলো কি!    
 এই ছোট্ট বয়সেই এতো দূর!...  লজ্জা পেলাম! 
  মাথা নিচু করে বুঝালাম।কফি খেতে খেতে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা হলো।অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেলাম ভাইয়ার হোস্টেলে।আমাকে দেখেই ভাইয়ার চোখ জোরা কপালে ঠেকল; এই বুঝি বেরিয়ে আসে অবস্থা। আশ্চর্য হয়ে বললেন, “ রাজু, তুমি! কখন এলে? ”  
গতকাল সন্ধ্যে নাগাদ এলাম।  
বাসা থেকে পত্রিকা অফিস হয়ে সোজা চলে আসলাম আপনার কাছে। 
— “ পত্রিকা অফিস! ওখানে কোনো? ”
— “ বা রে,আমার প্রকাশিত লেখার সম্মানী আনবো না বুঝি? ”               
 —ওহ, তা বুঝলাম। তো কবি সাহেব   কফি হাউজে কি একাই গেলেন? তা ক-কাপ  খেলেন শুনি? 
—কী! আমি কফি হাউজে যাইনি— কফি খেয়েছি ঠিকই, পত্রিকা অফিসের ক্যান্টিনে। কিন্তু তা তো আপনি দেখেন নি! বুঝলেন কী করে?  ভাইয়া শার্লক হোমসের মতো মৃদু হেসে  বললেন, “ আরে বোকা এটা তো সহজ ব্যাপার। তোমার ডান পায়ের জুতোটায় দেখ, কফির দাগ। খেতে গিয়ে পড়েছে হয়তো।আর কফি খাওয়ার পর মুখ মুছার টিস্যুটা এখনো তোমার হাতেই।এতেই বুঝতে পারলাম তুমি কফি খেয়েছ।কথাটি বলেই ভাইয়া হা!হা!হা! করে মুচকি হাসলেন। পিঠে হাত রেখে বললেন, চলো। “কোথায়”—
— “কোথায় আবার; বইমেলায়।” যাবি না? তো থাক আমি একাই যাই।ভাইয়ার দুষ্টুমি দেখে আমি হেসেই খুন।আমরা একটা রিকশা নিলাম।উদ্দেশ্য দোয়েল চত্বর। তার মানে আমরা এখন বইমেলায় যাচ্ছি। ইশ! ভাবতেই সে-কি  আনন্দ।কত গল্প হলো  রিকশায় বসে বসে। হঠাৎ ভাইয়া বললেন, “ কবি সাব, সম্মানী কত পেলেন? আমরা কী তবে পুরো মেলাটাই কিনে নেবো? আমি বললাম, “কুড়ি হাজারে যদি হয় ; তো পুরো মেলাটাই কিনে নেব—সমস্যা নেই! হা!হা!হা! আমিও ভাইয়া মৃদুস্বরে হাসলাম।   
“কুড়ি হাজার!”  অনেক টাকা। সাবধানে রেখেছ তো? 
জ্বি ভাইয়া, ব্যাগেই আছে—সমস্যা নেই। কেউ তো আর জানে না, আমি নগদ কুড়ি হাজার টাকা নিয়ে ঘুরছি।তাছাড়া বই কেনার টাকাতো খুচরা আছেই। তা ঠিক, তবুও সাবধানে রেখো আর সর্তক থেকো— ওকে। একটুখানি পর আমরা দোয়েল চত্বর নেমে, তিন নেতার মাজার পেরিয়ে প্রথমে ঢুকলাম বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে। জায়গাটা  কতশত বইয়ের স্টলে ভরপুর। হাজার-হাজার  বই স্টলে—সাজানো। বেচে বেচে সেরাবইগুলোই আমরা কিনে নিলাম। গোয়েন্দা গল্পের সব-কয়টা বই—ভাইয়ার উপহার।আমি তো নিজের টাকায় কিছু কিনতেই পারিনি। যদিওবা দিদামণি পকেটে কিছু টাকা গুজে দিয়েছেন; কিন্তু টাকাগুলোন কাজে লাগেনি—’।পকেটেই পড়ে রইল!সোহরাওয়ার্দী উদ্যাণে ঢুকে  একটি বই ভাইয়াকে উপহার দেই— তাও অনেক কষ্টে।উনি তো নিতেই চান না। পরে অবশ্য পকেটের টাকায়ও কিছু বই কিনলাম। মেলায় ঘুরে ঘুরে আমরা যতটা বই দেখলাম— কিনলাম তার অর্ধেকেরও কম।ঘুরতে ঘুরতে ভাইয়া আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, “ ওই যে দেখ সিসিমপুর এরিয়া—এটাই শিশু চত্বর। ” এখানে শুধু ছোটদের বই। যা খুশি কিনে নাও। আশ্চর্যের সুরে ভাইয়া বললেন, “ রাজু, দেখ ওদিকটায়, ওই যে স্টলের সামনে ছোট্ট ছেলেটা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে— কাঁধে ব্যাগ, ওহ কিন্তু বইয়ের উপর তীক্ষ্ণ নজরের বিষ ঢেলে দিয়েছে। এই বুঝি বইটা ছু মেরে নিয়ে যায়—শিকারি চিলের মতো।যেই না ছেলেটা বইটা হাতে নিল—ঠিক তখনি  বিক্রয়কর্মী ভদ্র মেয়েটি বলল, “চোর.., চোর.., ধর ওকে!”ভাইয়া দ্রুত দৌড়ে গেলেন; সাথে আমিও গেলাম। আসলে ছেলেটা পথশিশু। বইটা পড়বে বলেই হাতে নিয়েছে। এদিক-ওদিক দেখছিল বইটা পড়লে যদি কেউ ওকে বকুনি দেয়।তাই—’ কিন্তু বইটা নিয়ে পালাতে চায় নি ছেলেটা। ভদ্র মেয়েটি ওকে বই হাতে  দেখে; চোর বলাতে ও ভয়ে দৌড়ে ছিল।ভাইয়া ওর সাথে কথা বলাতে ওসব জানতে পারি।পুরো ঘটনা দেখে ওর প্রতি আমাদের মায়া হলো।ভাইয়া আর আমি ওর পছন্দ মতো  দু'টো বই উপহার দিয়ে চলে এলাম।রিকশায় আমি লজ্জায় ঢোক গিলে বললাম, “ জানো ভাইয়া, ঢাকায় আসার সময় আমার একটি ব্যাগ চুরি হয়ে যায়! ”ব্যাগটায় ছিলো, একখালি সাতকড়া, দু'টো শার্ট আর একটি চাদর। কিন্তু কে চুরি করল বুঝতে পারিনি। তবে টঙ্গী স্টেশনে  চুরি হয়েছে এটা নিশ্চিত। কেননা আমি তখন ঘুমে। ভাইয়া ভীষণ ক্ষেপে বললেন, “ ইশ! তুই এতো বোকা! এতো এতো গোয়েন্দা বই পড়িস তবু তোর বুদ্ধির গাছে ফল হলো না। ”  ভাইয়া এমনই রাগলে তুই করে বলে। এমনিতে আমায় তুমিই বলে।তুই কথাটি যদি-ও আমি ছাড়া কাউকে বলেন না ।আমি প্রসঙ্গ পাল্টে নিলাম; বললাম, “ সবগুলো বই-ই কী পড়তে হবে?” —“ এতো এতো বই পড়া সম্ভব নয়!”
—“ ওকে তো পড়িস না। পড়েও কি হবে, বুদ্ধির গাছে ফল ধরবে কী? গাদা কোথাকার—’  ভাইয়া বকাঝকা সত্ত্বেও মৃদু হেসে বললেন, “ তুমি তো জানোই বই পড়াটা আমার নেশা।যদিও আমার বুকশেলফে বই রাখার জায়গা নেই, তবুও বেশ কিছু বই কিনে ফেললাম। আমি সব ধরনের বই-ই কম বেশি কিনে রাখি। যদিও পড়া হয় না সবগুলো। কখন কোনটা দরকার হয় তা তো বলা যায় না। বই পড়া নিয়ে আমার প্রিয় একজন প্রাবন্ধিক, ফ্রান্সিস বেকন বলেছিলেন... কথাটি শেষ না হতেই আমি আগ্রহের ভাষায় বললাম, “ কি বলেছেন উনি?”  ইশ! বলছি তো। এতো তাড়াহুড়ো করলে বলবো না। আচ্ছা আচ্ছা আর কথার মাঝে কথার ফুল বুনবো না— সরি! ভাইয়া আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, “ বোকা। সরি বলতে হবে না শুন।” প্রাবন্ধিক ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন, "Some books are to be tasted, others to be swallowed, and some few to be chewed and digested" আমি মুচকি হেসে বললাম, “ কথাগুলো বেশ  জটিল লাগে—কিন্তু অসাধারণ!  হ্যাঁ, কথাগুলো জটিল মনে হলেও এর ব্যাখ্যা কিন্তু অসাধারণ। একজন পাঠক কোন বই কিভাবে পড়বে তার অনেকটা সংকেত লাইনগুলোতে বলেছেন। উনাকে কিন্তু ইংরেজি আধুনিক প্রবন্ধের জনক বলা হয়।জানিস? আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। আসলে তথ্যটি জানতাম না।কেবলমাত্র জানলাম। ভাইয়াও বিষয়টি বুঝেছেন ঠিকই। তারপরে বললেন, “ এই লাইনগুলো দ্বারা উনি বুঝাতে চেয়েছেন পাঠকরা কিছু বই শুধু স্বাদ নেয়ার জন্য পড়বে। এটা পুরোপুরি পড়তেও পারে। নাও পড়তে পারে। যেমন - মেলায় আমরা এতক্ষণ কিছু কিছু বই মলাট উল্টে-পাল্টে শুধু দেখেছি—কোন ক্ষেত্রে কিনেছি। আবার কোন ক্ষেত্রে কিনি নাই। মানে উল্টে পাল্টে দেখি। ভালো লাগলে বা প্রয়োজন লাগলে পড়ি। ভালো না লাগলে রেখে দেই।  আমি হাততালি দিয়ে বললাম,“ এজন্যই লোকে বলে ইংরেজি সাহিত্য কঠিন! ” আর এই কঠিন সাহিত্যের জনপ্রিয় ইতিহাস আপনি মুখস্ত প্যারেগ্রাফের মতো বোঝাচ্ছেন। এজনই বুঝি ইংরেজি সাহিত্য আর ভাষার প্রতি এতো টান আপনার?” ভাইয়া হেসে কুটিকুটি।বললেন, “ধূর বোকা। বাজে বকিস না।”  বাকিটা তবে আর বলছি না। আমি বললাম না, না,  বলো...  প্লিজ বলো ভাইয়া। রিকশা তখন দোয়েল চত্বর হয়ে, মালিবাগ মোড়ের কাছাকাছি প্রায়। যানজটের জন্য এগুতে পারছে না। ভাইয়া খানিকটা হেসে বললেন, “ কিছু বই হচ্ছে সোয়ালো বা গলাধঃকরণ করতে হয়। সেটা আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক। ভালো লাগুক বা না লাগুক।” — “ তার মানে আপনি পাঠ্য বইয়ের কথা বলছেন?” — হ্যাঁ - পাঠ্য বই। এগুলো আমাদের বুঝে হোক বা না বুঝেই হোক বাধ্য হয়ে পড়তে হবেই। আর কিছু বই হচ্ছে আমরা যেমন চুইংগাম খাই ঠিক তেমনি চিবিয়ে চিবিয়ে ধীরে ধীরে গলাধঃকরণ করতে হয়। কেননা এই বইগুলো খুবই মূল্যবান বা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো আমাদের সময় নিয়ে বুঝে বুঝে পড়তে হয়। যা আমাদের নীতি ও আদর্শ গঠনে সহায়তা করে। হতে পারে কোন দর্শন বা তাত্বিক বই যেগুলো জীবনমুখী জ্ঞানে ভরপুর।” ভাইয়ার মুখে ওসব কথা শুনতে বেশ চমৎকার লাগছিল! মনে হচ্ছিল পৃথিবীর কোনো দার্শনিকের পাশে বসে আছি। ঠিক তখনই ভাইয়া সাবধানতার সুর  বললেন, “ টাকাটা সাবধানে রেখেছ তো?—’ — “ জ্বি, টাকাগুলোন ব্যাগেই আছে।”
রিকশায় উঠেও দু-দুবার কথাটি বলেছেন—ভাইয়া।আমি একটি বিষয় খেয়াল করলাম  আমাদের আড্ডার ফাঁকে,—রিকশার লোকটা বার বার কারোর সাথে ফোনে কথা বলছিল; আমি এখানে আছি,এখন এই অমুক জায়গা হয়ে অমুক রোডে আছি ইত্যাদি... কিছুদূর যাবার পর লোকটা বলছে, “ আমি একটু পরই আসছি—মালিবাগ মোড় পেরিয়ে শান্তিনগর হয়ে। ভাইয়া কি জানি ভেবে হঠাৎ বললেন, “ না। আপনি মৌচাক মার্কেটের সামন দিয়ে যান।”
লোককটা বলল,“ ওদিকে জ্যাম হবে মামা।”
—“ ওদিকটায় যাই? ”
— “ না। যেদিকে বলছি সে দিকেই যান।” রেগে টং হয়ে কথাটি বলেছেন ভাইয়া।
কিছুক্ষণ পরেই রিকশা ভাইয়ার হোস্টেলে এসে থামল। কথা ছিল ভাইয়া আমাকে বাসায় পৌঁছে দিবেন। কিন্তু শুভ ভাইয়ার জন্য  তা হলোনা। শুভ ভাইয়া  মাহমুদ ভাইয়ার বন্ধু। আমাকে দেখবেন তাই হোস্টেল আসা। দেখা করার পরে আমি বাসার দিকে যাচ্ছি। ভাইয়া বললেন , “ রাস্তায় জ্যাম নেই, বিশ মিনিটের মধ্যেই বাসায় পৌঁছাতে পারবে। পৌঁছে ফোন করো, কেমন?মাথা নেড়ে সায় দিলাম; মলিন হেসে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে পথ চলছি— শুভ ভাইয়ার দেওয়া বাদাম খেতে খেতে।তক্ষুনি দেখলাম রিকশা মেইন রোডে না গিয়ে তালতলা মার্কেটের পিছনের রাস্তায় যাচ্ছে! চোখে পড়ল বিরাট ঝিল, ঝিলের ওপড় ছোট-ছোট ছুপড়ি। পথঘাট ওতো চিনি না। জিজ্ঞেস করলাম,ওদিকে কেনো যাচ্ছেন? মেইন রোডে যান। কথাটি শেষ না হতেই একদল মানুষ আমাকে ঘিরে ফেলল! পিছমোড়া বেঁধে চোখে কালো রঙের কাপড় পড়িয়ে নিয়ো চললো কোথায়? ঠিক জানিনা। বুঝতে পারলাম একটি ছোট্ট ঘরে এসেছি। ওরা আমার কাঁধের ব্যাগে রাখা কুড়ি হাজার টাকা নিয়ে নিলো। বাসার ঠিকানা চাইল— সাথে আব্বুর ফোন নাম্বারও। রিকশার চালকটা অট্টহাসি হেসে   বললো, “ উস্তাদ বখশিশ টা দেন, আমি যাই।” বুঝতে পারলাম রিকশার চালকও এই গ্যাংটার সাথে জরিত। আমি তখনো পিছমোড়া হয়ে বাঁধা।চোখ বাঁধা থাকায় বুঝতেও পারিনি— কোথায় আছি।সময়ের হিসেবে এতোক্ষণে বাসায় পৌঁছে ফোন দেবার কথা। ভাইয়া হয়তো এতোক্ষণে বুঝতে পারবেন আমি  কিডন্যাপারের কবলে পড়েছি।আর ওরা তো আব্বুর নাম্বারও চাইল—যদি-ও আমি দেইনি। তবে না দিয়েও উপায় নেই।একটি লোক আমার বাঁধন খুলল সন্ধ্যার আগে আগে।মুখটা ভীষণ কালো, খুচখুচে দাঁড়ি, চিকন ও লম্বা গঠনের।বুঝতে পারলাম  আমার ঠিকানা চাইতে এলো হয়তো— না-হয় আব্বুর নাম্বার। কিন্তু না বাঁধন খুলেই লোকটা চলে গেলো। ঘরটায় এখন আমি একা।ছোট জানালায় উঁকি দিয়ে বুঝলাম ঘরটি  দোতলা। ঠিক উপরের তলাতেই আমি বন্দী।ঘরটায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছোট্ট লাইটের মিটিমিটি আলো—আকাশের তারার মতো। পরিষ্কার দেখা যায় না, তবে ফ্যাকাসে আলোয় চোখে পড়লো, ঘরটায় ছড়িয়ে আছে কিছু পুরনো পত্রিকা, দুটো চেয়ার, মদের শিশি, কাপড়চোপড় সহ দেশীয় চাকু,ছুরি এবং অজ্ঞান করার ক্লোরোফর্ম। পালানোর জন্য খুঁজতে লাগলাম পথ। ঘরটার এদিক-ওদিক খোঁজে  আবিস্কার করলাম দুটো জানালা ছাড়া কিছু নেই; দরজার পাশেও কাকের মতো কালো লোকটা— পাহারায়। ঠিক তক্ষুনি পশ্চিমের জানালায় উঁকি দিয়ে অবাক হলাম! প্রাণটা বুঝি উড়ে এলো শূন্য মাটির দেহটায়! ল্যাম্পপোস্টের ঘোলা আলোতে দেখি ভাইয়া এবং তার বন্ধু (শুভ ভাইয়া) পায়চরি  করছেন। বুঝতে বাকী রইল না ভাইয়া আমার খোঁজে এসেছেন। ডাকলে কালো লোকটা শুনে ফেলবে—আর শুনলেই কেলেঙ্কারি!  কি করবো তাহলে?নিজেকে প্রশ্ন করি! মাথায় বুদ্ধি এলো, গোয়েন্দা গল্প পড়ে হয়তো বিপদের  সময় —বুদ্ধির গাছে ফল পাকল। ঠিক করলাম ছুরি দিয়ে হাত কেটে ভাইয়াকে চিরকুট পাঠাবো—কাজটা ঠিক না।কিন্তু  কাগজ-কলম কিছুই নেই; যা ছিল সবই ব্যাগটায়। ছুরি দিয়ে বাম হাতের আঙ্গুল কেটে রক্ত দিয়ে  ভাইয়াকে চিরকুট লিখবো ঠিক তখনি চোখে পড়লে—ঘরের কোণে মাকড়শার জাল।জাল নিয়ে পানি মিশিয়ে কালির মতো করে নিলাম। পুরনো পত্রিকার সাদা টুকরো অংশে লিখলাম, “ ভাইয়া, আমি উপরের ঘরটায় বন্দী। চিন্তা করো না আমি ভালোই আছি শুধু টাকার ব্যাগটা ওদের কাছে । কিন্তু আমাকে উদ্ধার করো... চিরকুটটা ভাইয়ার মাথায় ফেললাম পশ্চিমের  জানালা দিয়ে—পড়ল পায়ের কাছে। চিরকুটটা দেখল, ভাইয়ার বন্ধু শুভ ভাইয়া। খানিকটা পর দেখলাম পুরো বাড়িটা ঘিরে ফেললো পুলিশ বাহিনী। ততক্ষণে আমি কালো লোকটাকে পানি খাবো বলে, ঘরে ডেকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে নিচতলায় এসে গেছি। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দেখি  একটা লোক আমায় ধরার জন্য দৌড়ে আসছে। আমি  ইয়াব্বড় বাঁশের টুকরো দিয়ে   ওর কপালে ঠেকানো মাত্রই পড়ে গেলো। হ্যান্ডস আপ! কেউ পালানোর চেষ্টা করো না। বাড়ির চারপাশ আমরা  ঘিরে  ফেলেছি। গ্যাং সর্দার তখন নিচেতলায় মদ খেতে খেতে তাসখেলছিল।টেবিলের উপরে আমার টাকার ব্যাগটা সাথে মেলায়-কেনা  বইগুলো। দৌড়ে গিয়ে হাতে নেওয়া মাত্রই  ভাইয়া এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলন—শত বছরের অপেক্ষা শেষে এ যেন এক মিলনমেলা! ছলছল চোখে আমিও ভাইয়াকে   জড়িয়ে নিলাম। পুলিশ অফিসার বললেন, “ জানো না, এই টেক্কা মাস্তানকে দু'বছর ধরে খোঁজছে গোয়েন্দা বাহিনী। আজ তোমাদের জন্যই ওকে ধরা সম্ভব হলো। পরক্ষণেই আমরা  বাসায় চললাম।বাসায় চা খেতে খেতে  যখন দিদামণিকে পুরো ঘটনা বর্ণনা করে বলছিলাম। দিদামণি শুকনো গলায় ঢোক গিলে বললেন, “  মাহমুদুর, তুমি বুঝলে কি করে রাজু তালতলার   দিকেই গেছে? ” ভাইয়া কাপে চুমুক দিয়ে  গোয়েন্দার মতো বলতে লাগলো, “ আমার থেকে বিদায় নেবার আগে রাজুর দেখা হয়  শুভর সাথে—শুভ ওকে ভাজা বাদাম ভর্তি টোঙা  দেয়। সেই বাদাম খেতে খেতে ছোলা ফেলে রাজু পথ চলল। আমার হোস্টেল থেকে বাসায় আসতে বিশ মিনিটের বেশি লাগে না। যখন বুঝতে পারি রাজু ফোন করেনি। তখন বুঝলাম অঘটন কিছু ঘটেছে। কেননা রিকশার লোকটা বারবার কাউকে লোকেশন ট্র্যাকিং করতে করতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আমি বাদামের ছোলা দেখে দেখে ঝিল অবধি পৌঁছে যাই—কেননা এতটুকুন সময়ে ছোলা রাস্তায়তেই পড়েছিলো। তারপর চিরকুট পেয়ে পুলিশকে বলতেই... ভাইয়ার বণর্না শুনে মনে হলো, আমি বুঝি শার্লক হোমসের  সামনে বসে রহস্যের ঝলক দেখছি—তদন্তের গল্প শুনছি...        
please Follow & Share 

world books collect
join us on- telegram



You May Also Like

0 Comments