অসমাপ্ত চিত্রকর্ম-ছোট গল্প
অসমাপ্ত চিত্রকর্ম ,,
রাইয়ান জহির,,
রাইয়ান জহির,, মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু অপ্রত্যাশিত,অপ্রিয় ঘটনা প্রতিনিয়ত তাকে পীড়া দেয়,দগ্ধ করে।নিজেকে টেনে নিয়ে যায় সুদূর অতীতে,দূরে,বহুদূরে। স্মৃতির পাতা যেন আর বন্ধ হতে চায় না!এই বন্ধ হয় আবার পশ্চিমা ঝড়ে এলোমেলো হয়ে যায়!ওলট-পালট হয়ে যায় সব!আজ আপনাদেরকে হাজারো পুরুষের ঘুম কেড়ে নেয়া এক রূপবতীর জীবনে ঘটে যাওয়া এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায় নিয়ে যাবো।যেখানে তার রূপের সমস্ত অহংকার আর দর্প চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে একেবারে ধুলোয় মিশে গিয়েছে-
জগত সংসারে আমি আগাগোড়া একজন একা মানুষ।জাগতিক জীবনের তাড়না এখন আর আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় না।আমি থাকি আমার মত,জলের মত শান্ত,বৃক্ষের মত অনড় আর হয়তোবা থাকি অনেক দিনের অব্যহৃত গায়ে ধুলো পড়া পুরনো গীটারের মত যাতে কখনো নানা রঙের সুর বেজে উঠত।মানুষ হিসেবে আমি যথেষ্ট আত্মকেন্দ্রিক।আমি আমাকে ছাড়া পৃথিবীতে আর কাউকে ভালোবাসি না।মানুষের উপস্থিতি আমি কেন জানি আজকাল সহ্যই করতে পারি না।আমার খুব ভালোই লাগে, যখন দেখি আমার পাশে কেউ নেই।আমার কোনো স্বজন আর এখন আমার খবর নেয় না।এর চেয়ে ভালোলাগার আর কি হতে পারে?বাসি মুখে আমার সকাল বেলার কফির ভাগ আমি কাউকে দিতে চাই না।যৌনতার ছোঁয়ায় আমার বিছানার সাদা চাদরটাকে আমি নোংরা হতে দিতে পারি না।আমি আমার ভাগটা কাউকে দিতে রাজি নই,আমি আমার জন্য শুধু আমাকেই চাই।আজকের দিনটা আমার জন্য বড়ই বিশেষ একটা দিন।এইদিনেই আমি শৃঙ্খলিত জীবন থেকে পেয়েছিলাম চিরমুক্তি,আমার বড় প্রিয় মুক্তি।এই দিনে আমি আমার অপ্রিয়তম স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলাম।বিনা দোষে আমার জীবন থেকে তাকে বিতাড়িত করা আমার স্বজনরা মেনে নিতে পারে নি।তাই তারাও আমাকে বিতাড়িত করেছিল তাদের জীবন থেকে।আর আমি পেয়েছিলাম প্রিয় মুক্তির স্বাদ।এই দিনটাকে আমি আমার মত করে পালন করি।সারা দিন প্রিয় শ্যাম্পেইনের পেয়ালায় মুখ ডুবিয়ে আর প্রিয় গানগুলো শুনেই পার করে দেই এই দিনটি।আজকের পড়ন্ত বিকেলটিও এভাবেই কাটছিল।এর মধ্যে কিশোরী কাজের মেয়েটি এসে জানাল এক ভদ্র মহিলা আমার সাথে দেখা করতে চায়।খানিকটা অবাক হলাম আমি।গত কয়েক মাসে আমার সাথে দেখা করতে আসে নি কেউ।লেখা পাঠানোর ব্যাপারটি আজকাল প্রযুক্তি খুব সহজ করে দিয়েছে।তাই কাউকে দেখা দেয়া বা কারো সাথে দেখা করার যন্ত্রণাটা এখন আর নেই।খানিকটা বিরক্ত হলেও অনেকদিন পর কারো সাথে দেখা হওয়ার মত ঘটনাটা ঘটতে দিলাম।
তিনি এলেন বিকেলের সোনালী রোদ গায়ে মেখে।শেষ বিকেলের সূর্যের মত বয়স কিছুটা হেলে পড়লেও শরীরটা ধরে রেখেছেন দারুণভাবে।পড়ন্ত বয়সেও পুরুষ জাতির মনে কামনার আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার মত বাড়াবাড়ি রকমের রূপ এই মহিলাটির এখনও রয়েছে।তিনি এসে আমার বিপরীত দিকের চেয়ারটার পাশাপাশি দখল করে নিলেন আমার দুচোখের চাহনিও।কোন এক বিচিত্র কারণে সোনালী রঙের মধ্য বয়স্ক এই মহিলার দেহ থেকে আমি চোখ ফেরাতে পারি নি।মুখে একটা চিকন হাসির রেখা টেনে তিনি শুরু করলেন,
-আমি বেলা রহমান।আপনার লেখার খুব ভক্ত তা বলা যাবে না।তবে মাঝে মাঝেই পড়ি,ভালোও লাগে।আমার নিজের জীবনের একটা গল্প আমি আপনাকে বলতে চাই।আমার বিশ্বাস আপনি গল্পটাকে আপনার মত করে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন।আমি কি শুরু করব?
ইতোমধ্যেই শুরু করে দেয়া এই ভদ্রমহিলাকে থামিয়ে দেয়ার দুঃসাহস আমি দেখাই কি করে?মুচকি হেসে চালিয়ে যাওয়ার ইশারা করতেই স্বল্প বিরতি ভেঙ্গে তার গোলাপি ঠোঁট দুটো আবার নাচতে শুরু করল।
-ছোটবেলা থেকেই আমি প্রচণ্ড মাত্রায় পুরুষ বিদ্বেষী নারী।না এর কারণ হিসেবে আমি পুরুষ দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম ব্যাপারটা এমন নয়।আমি আমার মা-চাচীদের দেখতাম,তারা কি পরিমানে পুরুষের উপর নির্ভরশীল ছিল।তাদের যে নিজস্ব কোনো সত্ত্বা থাকতে পারে সেই ব্যাপারটি তাদের মাথায়ই আসেনি কখনো।শুধুমাত্র পরজীবী হিসেবে পুরুষের সাথে লেগে থেকে জীবন যাপন করাকেই তারা তাদের দায়িত্ব মনে করত।আমি শুধু এই বিষয়টিকে পাল্টে দিতে চেয়েছিলাম।তবে আপনাদের সামাজিক নিয়মনীতি মেনে আমিও বিয়ে করেছিলাম আবার নিজের ইচ্ছেমত সেটা আমি ভেঙ্গেও দিয়েছিলাম।আমি বারবার পুরুষদের নিয়ে খেলতে চেয়েছি,খেলেছি এবং প্রতিটা খেলায়ই আমি তাদেরকে নির্মমভাবে পরাজিত করেছি।রূপবতী মেয়েদের কামনার আগুনে পুড়তে তারা যে কতটা নিচে নামতে পারে তা ভেবে আমার খুব হাসি পায়।তাদের এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে আমি অনেক পুরুষকে ব্যবহার করেছি নিজের প্রয়োজনমত শুধু একজনের কাছেই আমাকে হেরে যেতে হয়েছিল অসহায়ভাবে।
-তিনি ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী।যার সাথে পরিচয় তাঁর আঁকা ছবির একটি প্রদর্শনীতে।তাঁর প্রতিটি চিত্রকর্মই ছিল জীবন্ত।এর মধ্যে কিছু ছিল প্রাকৃতিক দৃশ্য আর কিছু ছিল প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছু নারীর আবেদনময় চিত্রকর্ম।তাঁর চিত্রকর্মগুলো আমাকে এতটাই বিমোহিত করেছিল যে আমি সেখানটাতে নিজেকে খুঁজে পেতে চেয়েছিলাম।আমি তাঁর কাছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আমার একটি চিত্রকর্ম পেতে চাইলাম যেখানে নকল সভ্যতার নকল কোন চিহ্ন আমার গায়ে থাকবে না।তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে কিছুই জানালেন না।হয়তো ভাবনার জন্য সময় চাইলেন।তিনি যখন জানালেন ততদিনে বিষয়টা আমি ভুলে যেতে বসেছিলাম।তিনি ফোন করেছিলেন এক মেঘলা সকালে,আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাঁর বাগান বাড়িতে।আমি সাদা শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে,সাদা গাড়িতে চড়ে,তাঁর সাদা বাড়ির সামনে নামলাম,তিনিও সাদা পোশাকে আমাকে তাঁর সাদা রঙের বাড়িতে স্বাগত জানালেন।এই কাকতালীয় শ্বেত সমাহার আমাকে খানিকটা অবাক করল।আমার অবাক হওয়ার পালা আরও বেড়ে গিয়েছিল যখন দেখলাম তাঁর বাড়ির প্রতিটা আসবাবপত্র থেকে শুরু করে পুকুরঘাটটিও ছিল শ্বেতবর্ণের।তিনি আমাকে পুকুরঘাটে পজিশন নিয়ে বসতে বললেন।আমি সিটিং দেয়া মেয়েদের(যে মেয়েরা টাকার বিনিময়ে নগ্ন হয়ে চিত্রশিল্পীর সামনে পোজ দেয়) মত কোন প্রকার সঙ্কোচ ছাড়াই নিজেকে পোশাকমুক্ত করে স্বচ্ছজলে পা ডুবিয়ে বসলাম।তিনিও আমাকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পজিশন নিতে সাহায্য করলেন।আমাকে স্থির করে বসিয়ে দিয়ে তিনি সচল হলেন।এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি তুলিতে প্রথম আঁচড়টি কাটতে এতো সময় নিলেন যে আমি প্রায় বিরক্তই হয়ে গিয়েছিলাম।ভেবেছিলাম ছবি আঁকার চেয়ে আমার নগ্ন শরীরের সুধা পান করাই তার মূল উদ্দেশ্য হয়তো।কিন্তু তুলির আঁচড় শুরু করার পর কখনো আমার দিকে কখনো স্কেচ বোর্ডের দিকে তাঁর দৃষ্টিপাত ও তাঁর বা হাতের তুলির আঁচড় অনবরত চলতে থাকল প্রায় মধ্য দুপুর নাগাদ।এর মধ্যে দুপুরের খাবারের জন্য বিরতি নিলাম আমরা।কিছুটা সময় টুকিটাকি গল্পে কাটিয়ে তিনি আবার তুলির আঁচড়ে রঙ্গিন করতে লাগলেন তাঁর সাদা স্কেচ বোর্ড যার ক্যানভাস জুড়ে শুধুই আদিম পোশাকের উন্মুক্ত আমি।তাঁর সচ্ছ চোখ দুটো আমার সারা শরীর ঘুরে বেড়িয়ে আমাকে শিহরিত করে তুললেও তাঁর মাঝে আমি পুরুষ মানুষের কামুক দৃষ্টিপাত দেখতে পাই নি।তাঁর দৃঢ়তা আমাকে মুগ্ধ করল।কিন্তু একইসাথে আমার প্রিয় শরীরের প্রতি তাঁর উদাসিনতা আমাকে ব্যথিত করল।পোশাকের আড়ালে ঢাকা যে শরীর পাওয়ার জন্য হাজারো পুরুষ মানুষ আমার পায়ের ধুলোয় লুটোপুটি খায় সেই শরীরের উন্মুক্ত আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তিনি ভারী অন্যায় করেছেন।ক্রোধে আমার অন্তর জ্বলে উঠল।আমি পজিশন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম।তাঁর শিল্পকর্মে বাঁধা পড়ায় তিনি অবাক হয়ে তাকালেন।তিনি বিব্রত বোধ করলেন যখন আমি আচমকা তাকে জড়িয়ে ধরে তাঁর ঠোঁট দুটো আমার গোলাপি ঠোঁটের দখলে নিলাম।তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলেন কিন্তু পারলেন না।আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম তাঁর শরীর জেগে উঠছিল কিন্তু তাঁর মনের আকুলতা ছিল ছাড়া পাবার।নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল আমার।তাই আচমকা জড়িয়ে ধরার মতই আচমকা ছেড়ে দিলাম,মুক্তি দিলাম তাঁকে।পুকুরের সিঁড়িতে পরে থাকা শাড়িটি গায়ে জড়িয়ে ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত ও চূড়ান্ত মাত্রায় পরাজিত আমি তাঁর বাগান বাড়ি ছাড়লাম।আর ফেলে এলাম বিব্রত চিত্রশিল্পীর হাতে তাঁর আঁকা আমার অসমাপ্ত চিত্রকর্ম।
সেদিন আমার সৌন্দর্যের প্রতি আমার গভীরতম আত্মবিশ্বাস নিমিষেই চূর্ণ করে দিয়েছিল ওই লোকটি।তাই নিজেকে শান্ত করতে পারছিলাম না কিছুতেই।শাওয়ার ছেড়ে প্রায় ঘণ্টা খানেক ভিজেছিলাম,শুধু নিজেকে শান্ত করার আশায়।আমি সারারাত ধরে ভেবেছিলাম কিভাবে ওই লোকটাকে উচিত শিক্ষা দেয়া যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি আমাকে সারাজীবন অনুশোচনার অনলে পোড়ার মত শিক্ষা যে দিবে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারি নি আমি।
পরদিন সকালে চিন্তান্বিত,অস্থির মনে,আলুথালু বেশে,বাসি মুখে কফিতে চুমুক দিয়ে পত্রিকার পাতায় নিজের সকালটা শুরু করেছিলাম আমি।The Daily Star হাতে নেয়া মাত্রই একটি শিরোনাম নজর কেড়ে নিল আমার,
The Paint Brush of Anirban Rahman will never paint anything.
শিল্পী অনির্বাণ রহমানের তুলি আর কোন দিন কোন ছবি আঁকবে না।
সঙ্গে সঙ্গে হাত কাঁপতে কাঁপতে কফির পেয়ালাটা হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো।কখন যে নিজে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছি তা নিজেই জানি না।চেতনা ফিরলে দেখি কাজের মেয়ে রিমি আমার মুখে একটু পর পর পানির ছিটা দিচ্ছে।টিভিতে সকাল ১০ টার খবর দিচ্ছে।টিভির পর্দায় বারবার রিলে করছে,রাস্তার উপর পড়ে থাকা সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত শিল্পীর থেতলে যাওয়া নিথর দেহ,পাশেই পড়ে আছে শিল্পীর কাঁধে ঝোলান ব্যাগ,আর ব্যাগ থেকে উঁকি দিচ্ছে ছোট-বড় তুলি।আমার ভেতরটা নড়ে উঠল,আমি রাতের পোষাকেই গাড়িতে উঠলাম।সাদা কাফনে জড়িয়ে রাখা সকলের প্রিয় শিল্পীর কফিনটা একবার ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে হল কিন্তু নিজেকে বড় অপবিত্র মনে হচ্ছিল আমার,ফিরে এলাম।ভাবনার বেড়াজাল আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে সারাবেলা।আমি প্রায়ই স্বপ্নে দেখি শিল্পী অনির্বান রহমান তাঁর পুকুরের শ্বেত পাথরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একটি চমৎকার ছবি আঁকছেন।যখনই আমি ছবিটা ছুঁয়ে দিতে চাই তখনি ছবিটা মিলিয়ে যায়।
শেষ বাক্যটা তিনি এমনভাবে বললেন মনে হল এর পর আর কোন গল্প নেই।
আমি দেখলাম মধ্যবয়স্ক এই সোনালি কন্যার চোখ জুড়ে অনুশোচনার গভীর জল চিকচিক করছে।পশ্চিমাকাশে সূর্যটা লাল আভা ছড়িয়ে ডুবে গেলেও প্রকৃতি এখনো অন্ধকারে ঢেকে যায় নি।আমার খুব সিগারেটের তেষ্টা পাচ্ছিল।বুঝতে পারছিলাম না এই পরিস্থিতিতে সিগারেট ধরানোটা ঠিক হবে কিনা? আমি খুব অস্বস্থিতে পড়ে গেলাম...
হঠাৎ কী জানি হল কোন খেয়াল নেই।এক অপলক স্থির দৃষ্টিতে সেই কাঁচা সোনালি রঙের মহিলার মুখপানে কতক্ষন চেয়েছিলাম জানি না,তবে সম্বিত ফিরে দেখি সম্মুখ পাতান চেয়ারটি শূন্য।শূন্য আমার ভুবন শূন্য আমার কল্পলোক......


0 Comments