সম্পর্ক-ছোট গল্প

by - August 03, 2020


সম্পর্ক,,

     - ফারহানা খানম

ভেজা চুলে চিরুনি বুলাতে বুলাতে নিজেকে ভালো করে দেখে নেয় শ্বেতা। এই মধ্য তিরিশেও সে বেশ সুন্দরীই আছে , অন্তত ওর বয়সী আর দশটা মেয়ের থেকে ,শুধু ভাল করে পরখ করলে বোঝা যায় শরীরে কিছুটা মেদ জমেছে আর মুখের সারল্য তেমন থাকলেও চোখের কোণে যেন ক্লান্তি ভর করেছে। আজও নিজেকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবছে কারণ, অনেকদিন পর আজ সে সোহেলের সাথে একই মঞ্চে পারফর্ম করবে। সেখানে সোহেলের বউ নিশ্চয় থাকবে, শ্বেতার তো একবার অন্তত পরখ করে নিতে হবে কি নেই ওর যা রুমানার আছে? যাক গে, অতো ভাবতে আর ভালো লাগছে না।
শ্বেতা খাবার ঘরে আসে। আজ ছুটির দিন। ও নিজের হাতে অনুদা আর সারার পছন্দের বেশ কিছু খাবার রান্না করেছে। একটু পরেই অনুদা আসবেন তারপর মাসহ ওরা চারজনে খেতে বসবে। শ্বেতা দেখে নিলো সব ঠিকঠাক মত গুছিয়ে টেবিলে দেওয়া হয়েছে কি-না ।
অনুদা ওদের পরম আত্বীয়, যখন বাবা মারা গেলেন তখন এই অনুদা ওদের খুব খেয়াল রাখতেন। এত আত্মীয় স্বজন চারপাশে তখন, তবুও তারা যেন সব বসন্তের কোকিল। মৃত্যু বাড়ির ফর্মালিটি পালন করেই ফির গেলেন সবাই। কেউ ভাবেন নি এই মহিলা একটা কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে কী করে সব সামলাবেন! অথচ এই অনাত্মীয় অনুদা বাবার পেনশন এর জন্য কতনা অফিসে অফিসে ঘুরে সব ব্যবস্থা করলেন। মায়ের হাতে টাকা এলো কিছু। সংসারটা সচল হলো। নতুন ছন্দে মা-মেয়ের জীবন কাটতে লাগলো পাশে অনুদাকে নিয়ে। সোহেল চলে যাওয়ার পর শ্বেতা যখন খুব ভেঙ্গে পড়েছিল তখন এই  অনুদা ওর পাশে ছিল। চলে যাওয়ার আগে তিনি অনেক চেষ্টা করেছিলেন ওদের সম্পর্কটা যেন টিকে থাকে।  
স্টুডেন্ট লাইফে অনুদা ছিলেন  শ্বেতা আর সোহেলের গুরু সুমি আপুর সুত্র ধরেই সোহেলের সাথে শ্বেতার পরিচয়। তার ওপর ওরা সবাই  সাংস্কৃতিক জগতের মানুষ। নাটক গান আর কবিতা নিয়ে মেতে থাকতো সারাক্ষণ। আর স্টুডেন্ট লাইফ কেন? অনুদার সাথে শ্বেতার পরিচয় তো সেই ছোটবেলা থেকে একই পাড়ায় বাড়ি। ওদের আর শ্বেতার বড়ভাই শুভ্রর  খুব কাছের বন্ধু  উনি। ওর প্রথম গান শেখার হাতেখড়ি তো অনুদার কাছেই। সেই কিশোরী বয়সে অনুদার সম্পর্কে শ্বেতার ভীষণ দুর্বলতা ছিল, কিন্তু অনুদা যেন বুঝেও বুঝতে চাইত না ।
 এক তুমুল বৃষ্টির দিনে গান শিখতে বসে শ্বেতা যেচে অনুদাকে নিজের ভালোলাগার কথা বলেছিল। তখন সে এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে মাত্র। অনুদা চুপচাপ সব শুনলেন, কিছু বললেন না। হয়তো সেই মুহুর্তেই ওকে আঘাত করতে চায়নি ।
পরদিন শ্বেতা যখন  ছাদে রেওয়াজ করছিল তখন অনুদা এসে ওর পাশে বসেছিলেন তারপর হারমোনিয়ামটা নিয়ে নিজেই গাইলেন- মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে...। গান শেষ করে শুরু করেছিলেন কথা। বলেছিলেন, শ্বেতা যা বিধাতা দিতে চান না তা জোড় করে পেতে চেওনা  । আমার সাথে তোমার অনেক কিছুতেই অমিল সবচেয়ে বড় অমিল আমাদের বয়স আর আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। তোমায় আমি খুব কেয়ার করি, তোমার ভালো চাই, তোমার পাশে থাকতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু একে ভালোবাসা বলে ভুল করো না। আমাকে বড়ভাই কিংবা বন্ধু ভেবো।
শ্বেতা বলেছিল, অনুদা তোমার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।
কিন্তু অনুদা বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, যদি আর একবার তুমি ভালোবাসার কথা বল আমি আর কোনো সম্পর্ক রাখব না তোমাদের সাথে। অলীক স্বপ্ন দেখো না। নিজেকে সংযত করো। পড়ালেখায় মন দাও। আরও কত উপদেশ দিয়েছিলেন সেদিন।
সেইদিন শ্বেতা খুব কষ্ট পেয়েছিল। সারারাত কেঁদেছিল। বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন মনে হয়েছিল তার। মনে হয়েছিল অনুদা ওকে অপমান করেছে। কিন্তু তারপর নিজেকে শুধরেও নিয়েছিল। আসলে ওই বয়সটাই তো অমন দুরন্ত কৌতূহলে শুধু ছুটে চলা তাই সব ভুলে বন্ধু বলেই ভাবতে শুরু করেছিল অয়নদাকে।
এরপর কেটে গেল অনেকদিন। অনুদা ব্যাস্ত ছিলেন নিজেকে নিয়ে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় সোহেলের সাথে পরিচয়টা আরও গাঢ় হয়। ওরা একই ডিপার্টমেন্টে পড়ে, যদিও সোহেল  এক বছরের সিনিয়র। তাতে কী! ওকে ছাড়া শ্বেতা কিছু ভাবতেই পারতো না তখন। আসা-যাওয়া,  পড়ালেখা সব কিছুতেই সোহেল ওর সঙ্গি। হয়তো  সোহেলকে ও আঁকড়ে ধরেছিল অনেকটা অনুদাকে ভুলতেই। ওকে ভালো-ও বেসেছিল আসলে কোন আসনই শুন্য পড়ে থাকে না বেশিদিন। সোহেলের ভালোবাসায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল শ্বেতা। নিজেও সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছিল। বিয়েও  করেছিল খুব আয়োজন করে।
অনুদা মানে অয়নও খুব ধুমধাম করে  বিয়ে করেছিল, যাকে ভালবেসেছিল তাকেই। সেই সুমি আপুকে। খুব সুখেই ছিলেন দুজনে। তারা দুজন যখন একসাথে বেড়াতে বের হতেন মনে হতো মাণিকজোড়! সুমি আপুর চোখেমুখে সুখের দীপ্তি ঝলমল করতো সারাক্ষণ। কিন্তু সে সুখ রইল না বেশিদিন। দুঃখ হয়তো এমনি সে বেশিদিন সুখ কে রাজত্ব করতে দেয় না। সুমি আপু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। মা হারা সন্তানকে কোলে তুলে নিয়েছিলো শ্বেতা। ও আর মা খুব যত্ন করেছিলো। প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলো যেনো ছেলেটা বেঁচে থাকে। কিন্তু মা হারা সন্তানও তিনদিনের বেশী বাঁচেনি। সেই থেকে অনুদার এই বাড়িতে আসাটা খুব বেড়ে গিয়েছিল। হয়তো এ বাড়িতে এলে তিনি তার মৃত সন্তনের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেন। কোথাও কোথাও সুমি আপুর একটা আদল পেতেন। কেমন পাগলাটে হয়ে গিয়েছিলেন তখন। এর মধ্যে সারার জন্ম হলো। শ্বেতা চলে এলো মায়ের কাছে। ছোট সারাকে পেয়ে মা দারুন খুশি। ওকে আর ভাবতেই হতো না সারার কথা, সে আর সোহেল চাকুরী আর গান নিয়ে মেতে থাকতো সারাক্ষণ। এদিক-ওদিক বিভিন্ন দেশে প্রোগ্রাম করতেও গেছে সারাকে রেখে।
সারাকে পেয়ে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠেন অনুদা-ও। আর বিয়ের তিন বছরের মাথায় সোহেলের সাথে যখন ওর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় তখন শ্বেতার পাশে ছিলেন বড় ভাইয়ের মতো। অনেক চেষ্টা করেছিলেন ডিভোর্স আটকাতে, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। অপরপক্ষ না চাইলে কি কোন সম্পর্ক টেকে কখনো? এখন সারা আর মাকে নিয়ে ওর সংসার। সেখানে অনুদা বিশেষ জায়গা জুড়ে  আছেন বন্ধুর মতো, অভিভাবকের মতো যেমন আছে বড় ভাই শুভ্র। যদিও শুভ্র নিজের সংসার আর ব্যাবসা নিয়েই বেশি ব্যাস্ত থাকে, তবুও মাসে দু'একবার তো মাকে আর সারাকে দেখতে আসবেই। সাথে ভাবীও আসেন প্রায়ই। 
উফফ! আজ কেন যে এতো অতীতের কথা মনে পড়ছে? এসব ভাবনা ঝেড়ে ফেলে শ্বেতা গেল সারাকে ডাকতে দেখল সারা কার সঙ্গে যেন  ফোনে কথা বলছে। খুব ভালো মুডে আছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বুঝতে পারল সারা অনুদার সাথে কথা বলছে, ওর প্রতিটি কথায় কী উচ্ছ্বাস আর আহ্লাদ! ও বলছিল- চাচু তুমি আসার সময় আমার জন্য এইচ হ্যাগার্ড এর 'দি রিটার্ন অফ শী' বইটা নিয়ে এসো। আবার নতুন করে সবটা পড়তে ইচ্ছে করছে।
কই, এভাবে তো কখনো শ্বেতার কাছে কোনো আবদার করে না ও? 
আনমনা হয়ে যায় শ্বেতা। তবে কি মেয়েটা ওর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? অনুদা আর শ্বেতার সম্পর্ক নিয়ে সারার মনে কোনো প্রশ্ন জাগেনি তো? যা ওদের মাঝে এই আড়াল তৈরি করেছে! পরক্ষনেই ভাবে, তা কেন হবে। সারাকে শ্বেতা খুব যত্নে বড় করেছে। সমাজের এই জটিল দিকগুলো সম্পর্কে ওকে বুঝিয়েছে। আর এ-ও বুঝিয়েছে, অনুদা শুধুই শ্বেতার একজন ভালো বন্ধু, বিপদে- আপদে সুখে দুঃখে ওরা চারজন সবসময় একসাথে ছিল, আছে, আর থাকবেও। রক্তের সম্পর্কও হার মেনে গেছে ওদের এই আত্বিক সম্পর্কের কাছে। ও বুঝতে পারে, বাবা কী জিনিষ তাতো কখনো বোঝেই নি। সারা অনুদা সেই আদর ওকে দিয়েছে তাই অনুদা অনাত্মীয় হয়েও এত কাছের মানুষ হতে পেরেছে। মায়েরও অগাধ আস্থা আর বিশ্বাস অনুদার ওপর। আচ্ছা এই যে আত্ব্যিক সম্পর্ক এর কি কোনো ব্যাখ্যা আছে? 
শ্বেতা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। খোলা হাওয়ায় একটু নিঃশ্বাস নেওয়া দরকার। এত প্রশ্ন মনের মাঝে ফোঁড়ন কাটছে যে, ও হাঁপিয়ে উঠেছে। তাকিয়ে দেখে বাইরে চোখ ধাঁধানো  রোদে   মাধবীলতায় কয়েকটা টুনটুনি মনের আনন্দে দোল খাচ্ছে আর লাল-হলুদ প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলের চারপাশে। এমন দৃশ্য যে কাউকে উদাস করার জন্য যথেষ্ট। একটা দীর্ঘশাস বেড়িয়ে আসে বুক চিরে। এরকম দুপুরে খুব মন কেমন করে। ওর একাকী জীবনে মেয়ে-সারা একমাত্র অবলম্বন। মা ওর বন্ধু, আশ্রয়স্থল আর অনুদা ওর নির্ভরতা।
কলিং বেলটা বেজে উঠলো আর সঙ্গে সঙ্গে জানালার গ্রিলে বসা চড়ুইটা ভয় পেয়ে উড়ে গেল। যেনো এক নিমেষে পুরো অতীতটা উধাও হয়ে গেল পাখিটার মতই। অনুদা এসে গেছেন, মা এলেন বসার ঘরে। শ্বেতা গেল সারাকে ডাকতে।
খাওয়া শেষ করেই শ্বেতা চলে গেল তৈরি হতে। আজ ওর গানের প্রোগ্রাম আছে। ওখানে অনুদা সোহেলও গান গাইবে আজ। রেডি হয়ে এসে সারাকে আদর করে ওরা বেড়িয়ে পড়ে। মাকে বলে যায়- দেরী হলে চিন্তা করো না মা। খেয়ে নিও, সারাকে খাইয়ে দিও।
সারাপথ শ্বেতা ভাবতে থাকে, এতো বছর পর সোহেলকে দেখে ও নিজেকে  সামলাতে পারবে তো? সোহেল কি আগের মতই আছে? সারার মুখটা কি ওর মনে আছে? মনে আছে কি সারা নামের ওর একটা সন্তান আছে যাকে সে তিন মাস বয়সের পর আর কোনোদিন দেখেনি? আর অনুদার সাথে এই যে সম্পর্ক একি শুধুই বন্ধুত্ব? কাছের মানুষ? মায়ের কাছে উনি ছেলের মতো তাই কি? সত্যিকার অর্থে ছেলের চেয়েও বেশি কাছের নয়? আর সারার কাছে শুধুই কি চাচু? চাচু কি এতোটা কাছের হতে পারে বাবার মতো?আজ যদি সোহেল এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে, জবাব আছে কি শ্বেতার কাছে ?
গাড়িটা চলছে। কখনো জ্যামের মাঝ দিয়ে, কখনো ফাঁকা অলিগলি ঘুরে। গান বেজে যাচ্ছে। সে গান শ্বেতার তন্ময়তাকে ভাঙাতে পারছেনা। কিন্তু তন্ময়তা ভাঙল হাতের স্পর্শে। চমকে উঠলো শ্বেতা। 
অনুদা বললেন, শ্বেতা এসো নতুন করে জীবনটা শুরু করি।
শ্বেতা বলল, তা আর হয় না অনুদা। যদিও আজ এতোটা পথ আমরা একসাথেই হেঁটেছি, তবুও দুটো জীবন বয়ে গেছে আলাদা পথে। সারা আমার যতটা তোমারও ততোটা আদরের আমি জানি।
-তাহলে কেন হয় না শ্বেতা ? 
-হয় না অনুদা কারণ আমাদের জড়িয়ে যে মানুষগুলো বেঁচে আছে আজ এতকাল পর একপথে চলতে গিয়ে তাঁদের জীবনে ছন্দ পতন ঘটাতে পারবো না আমি। তাছাড়া সেদিনের অপমান আমি আজো ভুলিনি। সবচেয়ে বড় কথা সুমি আপুর জায়গায় নিজেকে বসাতে পারবো না আমি। তেমনি সোহেলের জায়গাটাও তোমাকে দিতে পারবোনা। এই এতো বছর আমি এই একলা ব্যস্ত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, সেখানে  অন্য কোনো সম্পর্ক মেনে নিতে পারবো না। 
অয়ন হাতটা সরিয়ে নেয়। শ্বেতা ম্লান হেসে বলল, তাই বলে বন্ধুত্ব টা কিন্তু অস্বীকার করিনি। তুমি এভাবেই আমাদের পাশে থেকো অয়ন। 
join us on- telegram



You May Also Like

0 Comments